একটু জল পাই কোথায়, বলতে পারেন?

নেদারল্যান্ড ঠিক কিভাবে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ করে এবং সুস্থ পরিবেশ তৈরিতে সাধারন মানুষের সদিচ্ছা ও সর্বোপরি সক্রিয় ভূমিকা ঠিক কতখানি…

অগ্নিভ সেনগুপ্ত​

ইদানীং, পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। একসম​য়ে মানুষ পরিবেশকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে, আর সম​য়বিশেষে প্রকৃতিও তার প্রতিশোধ নিতে ছাড়েনি। আমরা যখন স্কুলে ছিলাম​, ইকো-সিস্টেম সম্বন্ধীয় পাঠ্য বাধ্যতামূলক ছিল​, যাতে ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সাথে আমাদের এক নিবিড় যোগ গ​ড়ে ওঠে। যাতে আমরা প্রকৃতির গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বুঝতে শিখি। তবে, বিজ্ঞানের অগ্রগতির স্বার্থে প্রকৃতিকে আমরা বারংবার আমরা বলিকাঠে চ​ড়িয়েছি। গাছ না কাটলে কাগজ পাবো কোথা থেকে? আগুন না জ্বালিয়ে উৎপাদন​-শিল্প গ​ড়ে উঠবে কি ভাবে? ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেফ্রিজারেশনে এখনো বহু জায়গায় সি-এফ​-সি (ক্লোরো-ফ্লুরো-কার্বন​) ব্যবহৃত হ​য়, যা ওজোন লেয়ারকে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

তা ছাড়া, যুদ্ধ তো আছেই। কোথায় যেন পরেছিলাম​, মানুষ কিলার​-এপ থেকে বিবর্তিত হ​য়েছে, তাই যুদ্ধ মানুষের মজ্জাগত​। জনজীবন এবং অর্থনৈতিক ক্ষ​য়ক্ষতি তো ছেড়েই দিলাম​, যুদ্ধ মানে প্রাকৃতিক সম্পদেরও প্রভূত ক্ষতি। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর প্রভাব নিরক্ষীয় দেশে তো বটেই, ইয়োরোপের মতো আপাত​-শীতপ্রধান মহাদেশেও প্রকট হ​য়ে উঠছে। নেদারল্যান্ডসের মতো উত্তর​-পশ্চিমের দেশেও গ্রীষ্মকালে পারদ ৩৫ ডিগ্রি ছাড়াচ্ছে মাঝেমধ্যেই, আর ইয়োরোপের পশ্চিম বা দক্ষিণের দেশগুলোর কথা তো ছেড়েই দিলাম​। ফ্রান্স, স্পেনের মতো দেশে এই বছর প্রবল তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস আছে, যার ফলে জনজীবন প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সোশাল মিডিয়া ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমরা সবাই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবল জলকষ্টের খবর পেয়েছি। মাটির তলার জলাধার প্রায় নিঃশেষিত​, নদী-পুকুর ইত্যাদির জল আমরা এতো দূষিত করেছি যে তা ব্যবহারের যোগ্য ন​য়​। রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ নির্দ্বিধায় আমরা পুকুর​-নালা-নদীতে ফেলছি, খাল​-পুকুর বুজিয়ে ফেলে সেখানে বহুতল বাড়ি তৈরী করছি, আর​, আপনার ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, পূজার উপাচার বা মূর্তি বিসর্জনেও জলকে দূষিত করে তুলছি। তার সাথে যোগ হ​য়েছে ব্যবহৃত জলকে রিসাইকেল করে পুনঃব্যবহারের উপযোগী করে তোলার পরিকাঠামো এবং সদিচ্ছার অভাব​। পানীয় জলের একমাত্র সূত্র – আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার​, যা আমরা এতোদিন ব্যবহার করে এসেছি, তা তো একদিন শেষ হওয়ারই ছিল​! সেই ভূগর্ভস্থ জলকে ব্যবহার করার আগেও আমরা ওয়াটার-পিউরিফায়ারে তাকে পরিশুদ্ধ করছি, কারণ সম​য়বিশেষে দূষণের অংশ সেখানেও বিদ্যমান​। আজ আমরা যেই পৃথিবীতে বাস করছি, সেখানে বাতাস দূষিত​, খাদ্য দূষিত​, এমনকি পানীয় জলও দূষিত – ভ​য়াবহ সম​য়​।

এক রসিক জলাতঙ্ক রোগীর গল্প শুনেছিলাম​, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে-শুয়ে তিনি ‘Rime of Ancient Mariner’-এর সেই লাইনদুটো আউড়ে যেতেন​, ‘Water, water, everywhere, nor any drop to drink.’ আমাদের পরিণতিও কি সেই রোগীর মতোই হতে চলেছে, যেখানে পুকুর​-নদী-ভর্তি জল আর আমাদের পানের উপযুক্ত থাকবে না কিছুদিনের মধ্যেই?

যাক​, দূষণ​-জলকষ্ট ইত্যাদি নিয়ে আপনাদের জ্ঞান আমার থেকে অনেক বেশী, তাই সেই বিষ​য় নিয়ে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখাটা উদ্দেশ্য ন​য়​। আগের প্রস্তাবনার প্রাথমিক উদ্দেশ্য নেদারল্যান্ডসের দূষণ ও পানীয় জল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা আপনাদের জানানো।

প্রথমে আসি দূষণ​-নিয়ন্ত্রনে। যেমন আপনারা অনেকেই জানেন​, নেদারল্যান্ডসে সাইকেলের সংখ্যা জনসংখ্যার থেকে বেশী। এখানকার বেশীরভাগ মানুষ কাছেপিঠে যেতে গেলে, এমনকি অফিস যেতে গেলেও সাইকেলে যেতেই বেশী পছন্দ করেন​। তার দুটো উপকার​, প্রথমত শরীরচর্চা, আর দ্বিতীয়ত দূষণরোধ​। এখানে সরকারের তরফ থেকেও সাইকেল-আরোহীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হ​য়​, যেমন এক বিস্তির্ণ এবং ব্যাপৃত সাইকেল​-লেন, গাড়ী বা অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় রোড​-প্রায়োরিটি ইত্যাদি। নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীরও নাকি অফিস যাওয়ার প্রধান পরিবহন সাইকেল​! সহজ হিসাব​, গাড়ীর ধোঁয়া কম ইজ ইকুয়াল টু দূষণ কম​।

সাইকেলে চড়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুত্তে

এখানে রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের চল খুব​। সাধারণ গৃহস্থ্য বাড়ীতেও ম​য়লা ফেলার তিনটে আলাদা জায়গা – অর্গ্যানিক ওয়েস্ট, যেমন রোজকার সবজি বা ফলের খোসা, ডিমের খোলা, মাছ​-মাংসের কাঁটা ইত্যাদি, পেপার ওয়েস্ট, যেমন কাগজপত্র​, প্যাকিং বাক্স ইত্যাদি এবং প্ল্যাস্টিক ওয়েস্ট, যেমন দুধের ক্যান​, প্ল্যাস্টিক​-ব্যাগ ইত্যাদি। তা ছাড়া কাঁচের জিনিষ ফেলার আলাদা ব্যবস্থা, আর ব​ড় কোন ডিসপোসেবল, যেমন ভেঙে-যাওয়া চেয়ার​, কম্প্যুটার​, বড় লোহার কোন জিনিষ ইত্যাদির জন্যে নির্ধারিত জায়গা আছে, যেখানে আপনাকে গিয়ে ফেলে আসতে হবে। সমস্ত ধরণের আবর্জনা আলাদা হ​য়ে যাওয়ার ফলে রিসাইক্লিঙের সুবিধা – অর্গ্যানিক ওয়েস্ট চলে গেল ক্ষেতের সার হিসাবে, পেপার ওয়েস্ট চলে গেল পেপার মিলে, আর প্ল্যাস্টিক বা লোহার ওয়েস্ট দিয়ে নতুন আসবাব বা কন্টেনার তৈরী হ​য়ে গেল​। সহজ​, অথচ কার্যকর​।

আর​, এই রিসাইক্লিঙের জন্যে প্রত্যেক মিউনিসিপ্যালিটি নির্দ্দিষ্ট কর ধার্য্য করে প্রত্যেক নাগরিকের জন্যে। যদি আপনি উপকার পান​, একটু বেশী ট্যাক্স দিতে আপত্তি কোথায়​?

পানীয় জলের ক্ষেত্রেও একই বিধান – রিসাইক্লিং। নেদারল্যান্ডসে ৯৯% মানুষ শুদ্ধ পানীয় জলের সুবিধা উপভোগ করে। এই দেশে প্রথম এসে যেটা আমাকে অবাক করে দিয়েছিল​, এখানকার সাধারণ কলের জলও পানের উপযোগী, যা ভারতে ভাবাই যায় না। অ্যাকোয়াগার্ড বা অন্যান্য ওয়াটার পিউরিফায়ারের কোন প্র​য়োজন নেদারল্যান্ডসে নেই। বৃষ্টির জল​, বা আপনার বাড়ীর বর্জ্য জল​, বা ক্যানালের জল – পরিশুদ্ধ হ​য়ে আপনার কাছে পৌঁছে যায় ব্যবহারের জন্যে। ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট এই দেশে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষ​য়​, প্রথমত সমুদ্রপৃষ্টের নীচে অবস্থানগত বিপত্তি এড়াতে, আর দ্বিতীয়ত প্রত্যেক পরিবারের জন্যে শুদ্ধ পানীয় জল​, সেচের জন্যে পর্যাপ্ত জল ইত্যাদি যোগান দেওয়ার জন্যে। জল পরিষেবাও সাধারণ ট্যাক্সের আওতায় প​ড়ে, আর প্রত্যেক মিউনিসিপ্যালিটিতে ভোটের মাধ্যমে ওয়াটার বোর্ড তৈরী হ​য় এই পরিষেবাকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্যে।

সরকারী প্রচেষ্টা ও পরিকাঠামো তো আছেই, তার সাথে যোগ হ​য়েছে সাধারণ মানুষের সদিচ্ছা। এই দেশে গঙ্গা বা ব্রক্ষ্মপুত্রের মতো পবিত্র নদ বা নদী নেই, আর হ​য়তো সেই কারণেই বিভিন্ন আবর্জনা, পুজোর ফুল ইত্যাদি ফেলে কেউ এখানকার জলাধার দূষিত করে না। ভারতবর্ষে শর্পাঘাতে কারোর মৃত্যু হলে সেই মৃতদেহ দাহ করা হ​য়না, নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হ​য়​। ওই, লক্ষীন্দরকে বেহুলা গিয়ে যমাল​য় থেকে ফেরত নিয়ে আসবে, সেই আশায়​। লক্ষীন্দর ফেরে না, শুধু সেই পচা-গলা মৃতদেহের জীবাণু জলে মিশে সেই জলকে ধারণের অযোগ্য করে তোলে। নেদারল্যান্ডসে কুসংস্কার কম​, তাই হ​য়তো সংস্কার বেশী।

ইয়োরোপের বেশীরভাগ দেশই ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশনের সুফল এবং কুফল​, দুই-ই ভোগ করেছে। দুটো বিশ্বযুদ্ধের ক্ষ​য়ক্ষতি দেখেছে। আর​, সেই কারণেই হ​য়তো প্রকৃতি সংরক্ষণে এরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আজ ভারতবর্ষের জলকষ্ট খবরের শিরোনামে, আশা রাখি কালকের সমাজে জল​-সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে “ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *