বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তর – ছবি ও আঁকায়

নগরের পথে পথে দেখেছ অদ্ভুত এক জীব 
ঠিক মানুষের মতো 
কিংবা ঠিক নয়, 
যেন তার ব্যঙ্গ-চিত্র বিদ্রূপ-বিকৃত! 
তবু তারা নড়ে চড়ে কথা বলে, আর 
জঞ্জালের মত জমে রাস্তায়-রাস্তায়। 
উচ্ছিষ্টের আস্তাকূড়ে ব’সে ব’সে ধোঁকে 
আর ফ্যান চায়। 

প্রেমেন্দ্র মিত্র
মিহিররঞ্জন মণ্ডল

ছবির গল্প, গল্পের ছবি – ৪

কলকাতার অভিজাত পরিবারের এক তরুণ। নাম সুনীল জানা। সেন্ট জেভিয়ার্স ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়া ইংরেজির তুখোড় ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে বামপন্থী মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। সংস্পর্শে এলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টর নেতা পি সি যোশীর। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে তখন সক্রিয়ভাবে বামরাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন সুনীল।
১৯৪৩ সাল। সারা অবিভক্ত বাংলা তখন অবর্ণনীয় দুর্ভিক্ষের কবলে। বাংলা ১৩৫০ সালে শুরু হয়ছে বলে একে বলা হয় পঞ্চাশের মন্বন্তর (bengal famine of 1943) । সারা বাংলার প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষ কেবলমাত্র খরা, অনাবৃষ্টির জন্য হয়নি। এর পিছনে ছিল ইংরেজ শাসকদের বিশেষ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের হেলাফেলা মনোভাব ও একগুঁয়েমি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপান বার্মা ( মায়নামার) দখল করছে। বার্মা থেকে তখন চাল আমদানি হত। সেটা বন্ধ হয়ে গেল। দেশে যা ফসল ফলেছিল তার সুষম বন্টন হল না। যুদ্ধে সৈন্যদের রসদের জন্য প্রচুর চাল মজুত করা হল। শুধু শহর কলকাতার মানুষ ও কলকারখানার শ্রমিকদের জন্য চালের ব্যবস্থা হল। বাংলার বাইরে থেকে যাতে চাল না আসে তার জন্য করা হল কর্ডনিং ব্যবস্থা। ধান সংগ্রহের জন্য লাইসেন্স পেল ইংরেজদের পা চাটা কিছু মজুতদার। তারা যথেচ্ছভাবে খাদ্যশস্যের কালোবাজারি শুরু করে দিল। ফলে দূর্ভিক্ষের করালগ্রাসে পড়ল গোটা বাংলার সাধারণ মানুষ।

গ্রামের গরীবগুর্বো মানুষগুলো একমুঠো চাল যোগাড় করতে পারছে না। কিছু না পেয়ে শাক ঘাস পাতা খেতে আরম্ভ করল। শেষে বেঁচে থাকাই যখন দায় হয়ে পড়ল, তখন দলেদলে মানুষগুলো হেঁটে আসতে লাগল কলকাতার দিকে।কলকাতায় রাস্তায় একমুঠো অন্নের জন্য তখন লোকের দোরে দোরে ঘুরে মরছে এইসব মানুষেরা। ভাত না দাও একটু ভাতের ফ্যান দাও। একটু ফ্যানের আশায় মা তার কোলের সন্তানকে নিয়ে ঘুরছে। মায়ের শুকনো স্তন চুষতে চুষতে কখন বাচ্চাটা মারা গেছে মা টের পায়নি।

কলকাতার পথেঘাটে তখন দেখা গেল অনাহারে মরা মানুষের মৃতদেহ। কাক শকুন ও কুকুরে টানাটানি করছে সেই মৃতদেহ। পরে কলকাতার পৌরসভার গাড়িতে করে সেইসব মৃতদেহ তুলে নিয়ে এসে গাদা করে জ্বালিয়ে দেওয়া হত। দেশের যে কটি সংবাদপত্র ছিল তারা সেই খবর প্রকাশ করতে পারছে না। ইংরেজ শাসকেরা শুরু করে দিল সংবাদপত্রের উপর খবরদারি। যাতে ভারতের অপরপ্রান্তের মানুষ দুর্ভিক্ষের প্রকৃত অবস্থা না জানতে পারে।

কিন্তু কিছু বিদেশী সংবাদপত্র মারফত ভারতের দুর্ভিক্ষের খবরের কিছুটা পৌঁছেছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। অস্ট্রেলিয়া সাহায্যের জন্য এক জাহাজ গম পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু চার্চিল সেই গম নিতে দেননি। কানাডা আমেরিকাও সাহায্য করতে চেয়ে বিফল হয়েছিল। চার্চিল তখন বলছেন যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের মানুষেরা মরছে, ভারতীয়রা মরবে তাতে আর আশ্চর্য কী! মনে পড়ে যায় ভারতীয়দের সম্পর্কে চার্চিলের সেই ইতরসুলভ উক্তি— ” I hate Indians. They are beastly people with a beastly religion. The famine was their own fault for breeding like rabbits. ” অর্থাৎ ” ভারতীয়দের আমি ঘৃণা করি। ওরা নিজেরা যেমন জঘণ্য, তেমনি ওদের ধর্ম। দুর্ভিক্ষ হয়েছে ওদের নিজেদের দোষে। খরগোশের মতো শুধু বংশবৃদ্ধি করার ফলে। “
পি সি যোশি সুনীলকে বললেন গ্রামেগঞ্জে ঘুরে এই ভয়াবহ অবস্থার ছবি তুলতে। ডকুমেন্টেশানের জন্য এটা প্রয়োজন। ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ সুনীলের ছোটবেলা থেকে। ঠাকুরমার দেওয়া একটা কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরায় হাতেখড়ি। ফিল্ম ডেভেলপ প্রিন্ট সব নিজেই করতে পারতেন। তাই যোশির কথামতো ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে ছিলেন আর একজন। তিনি হলেন বিখ্যাত শিল্পী চিত্তপ্রসাদ। দুর্ভিক্ষের ছবি যা দেখবেন তা তক্ষুনি স্কেচ করবেন।

চিত্তপ্রসাদের ক্যানভাসে “ক্ষুধার্ত বাংলা”

নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই। গ্রামেগঞ্জে ঘুরেঘুরে তাঁরা দুজনে দুর্ভিক্ষের ছবি ধরে রাখতে লাগলেন ক্যামেরায় আর স্কেচবুকে। সে সব ছবি কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ” পিপলস ওয়ার ” এ বের হয়েছিল। সঙ্গে যোশির প্রতিবেদন। পরে ” পিপলস এজ ” তা বেরিয়েছিল। ফলে এই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা সম্বন্ধে সারা বিশ্বের মানুষ জানতে পেরেছিল। এ প্রসঙ্গে আরও দুজন শিল্পীর নাম এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। তাঁরা হলেন জয়নুল আবেদিন ও সোমনাথ হোড়। তাঁরাও এই দুর্ভিক্ষের ছবি স্কেচ করেছিলেন।
সুনীলের তোলা ছবি দেখে বিখ্যাত লাইফ ফটোগ্রাফার মার্গারেট বোরক্ হোয়াইট ভারতে এসে পি সি যোশির মাধ্যমে সুনীলের সঙ্গে দেখা করলেন। মার্গারেট ভারতে এসেছিলেন ১৯৪৫ সালে। গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল সুনীলের সঙ্গে। সুনীলকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ও অন্ধ্রে গিয়েছিলেন। তখন বাংলা ছাড়াও এইসব জায়গায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি সুনীলকে সঙ্গে নিয়ে ছবি তুলেছেন।

সুনীলের ক্যামেরার চোখ ছিল অসাধারণ। কিন্তু নিজের দৃষ্টি ছিল ক্ষ্ণীণ। ছেলেবেলায় গ্লোকমা হয়ে একটা চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর এক চোখে অল্পই দেখতে পেতেন। তা সত্ত্বেও যে সব ছবি তিনি তুলেছিলেন তা সমাদৃত হয়েছে সারা বিশ্বে।
ষাট বছর ধরে ছবি তুলেছেন তিনি। দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা, নব ভারতের উন্নতির বিভিন্ন পর্যায়, কৃষক বিদ্রোহ সবই ধরা পড়েছে তাঁর ক্যামেরায়। বিখ্যাত নৃতত্ববিদ ভেরিয়ার এলুইনের সঙ্গে থেকে ভারতের বিভিন্ন উপজাতির জনজীবনের ছবি তিনি তুলেছিলেন। এইসব নিয়ে তাঁর নিজের বইও আছে–
” দি ট্রাইবালস্ অফ ইন্ডিয়া “।
এই বর্ণময় মানুষটি ১৯৭৮ সালে পাকাপাকিভাবে লন্ডন চলে যান। ওখানে ওঁর স্ত্রী শোভা জানা ডাক্তারি করতেন। লন্ডনের নেহেরু সেন্টারে তাঁর তোলা ছবি সংরক্ষিত আছে। সুনীলের ছবি নিয়ে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লী, লন্ডন, সানফ্রান্সিসকো, নিউইয়র্কে বড় প্রদর্শনী হয়েছিল। পরে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে ছেলে অর্জুনের কাছে চলে যান। ওখানেই পরিণত বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
দুঃখের কথা হল ফটোগ্রাফির চর্চা আগের থেকে অনেক বেড়েছে। নামিদামি ক্যামেরার এখন অনেকেরই হাতে। নিজেকে উজাড় করে প্রকৃত ফটোগ্রাফির চর্চা তেমন করে চোখে পড়ে না। এ প্রজন্মের অনেকে হয়ত সুনীল জানার নামও শোনেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *