গড়িয়াহাটের মোড়ে…

চিরন্তন ঘোষ

সেদিন দু’পশলা বৃষ্টি না হলে, আজকের রাত্তিরটা কি খুব একটা আলাদা হতো? হয়তো নয়, অন্য কিছু নিয়ে ভাবতাম! অবক্ষয় যার জীবনের রীতি, সে কি সোজা, সরলকে মেনে নিতে পারে?

আজ কুড়ি বছর পরে, স্মৃতির কয়েকটা জায়গা ধোঁয়াশা, আর কিছু উজ্জ্বল মুহূর্ত, সব মিলিয়ে এক রোমন্থনের চালচিত্র | সবে মাধ্যমিক দিয়েছি, পরীক্ষার ফলে যে ভীষণ ভালো একটা কিছুর সংবাদ আসবে, তেমন কিছু নয়… ছুটির এই তিন মাস, ভালো ছেলের ভেক ধরে থাকতে চাই যাতে একটু বাঁচতে পারি নিজের মতো করে । বাড়িতে বাবা-মা, আমার ভালোর জন্যে নতুন এক হাঁড়িকাঠের আয়োজন করার আগেই নিজেই বললাম – ব্রিজ কোর্স করবো, যাতে জয়েন্ট, আই. আই. টি., ইত্যাদিতে প্রস্তুতির সুবিধে হয় … এগারো ক্লাসের পড়া আগে থেকেই শেষ করানোর জন্য এই কোচিং! বাবা-মা ভাবলো, ভূতের মুখে রাম নাম, তবু যদি একটু “সিরিয়াস” হয় ছেলে! হায়রে বিধাতা, অপত্য স্নেহ সত্যিই অন্ধ! যে ছেলের মার্কশিট লাল কালিতেই দাগী, সে করবে পড়াশোনা তাও আবার ছুটির সময়!

আসল কথা হলো, বাড়ি থাকলে কৈফিয়ৎ দিতে হবে – কি করছি; আর বেরোবার সময়ে হাজার ফ্যাঁকড়া – কোথায়, কেন, কখন ফিরবে, কি দরকার? মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেকে লোকে আর যাই বারণ করুক, পড়তে যাবো বললে, স্বয়ং ভগবানও পথ ছেড়ে দাঁড়ান – বেচারা বাপ-মা তো কি, জগাই-মাধাই ও বোধ হয় গলে যেত! গড়িয়াহাটের ডোভার লেনের কাছেই “স্কিম্যাটিক টিউটোরিয়াল”, এতো জায়গা থাকতে সেখানেই আমার কি মধু ছিল এটা কেউ তলিয়ে দেখলো না … বা ভাবলো, নচ্ছারটা এমনিতেই তো কিছু লেখাপড়া করে না, বন্ধুদের দেখেও যদি কিছু শেখে! বাবার অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা নিতাম আমার লেখা পড়ার বয়সে – সে ভদ্রলোক হয়তো ভেবেছিলেন ম্যাগ্নেটিসমের ইণ্ডাকশনের মতো যদি কিছু ভালো গুণ তার ছেলের মধ্যে ঢুকে যায় সৎসঙ্গে পড়ে!

ছেলে হিসেবে গাড়োল হলেও, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়েছি – তাই নামে কেটে গেলো স্কিম্যাটিক-এর এন্ট্রান্স পরীক্ষা! সত্যি, পরীক্ষা দিয়ে ঢোকা আমার পক্ষে কস্মিন কালেও সম্ভব ছিল না… বিধির বিধান কে খণ্ডাবে, তাই বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়লো! প্রথম কদিন, ভাগ্যের এই করুণাকে আর বাবার এয়ারপোর্টের ডবল ডিউটির কষ্টকে সত্যিই মনে রেখে ভালো পড়ুয়া হতে চেয়েছিলাম, চেষ্টাও বোধ হয় কিছু করেছিলাম| কিন্তু, কয়লা হাজার ধুলেও সেই কালো … কয়েকদিন ক্লাসের পড়া বুঝলেও, ‘পুনর্মূষিকো ভব’, আর কিছু মাথায় ঢোকে না। ক্লাস ফাইভ থেকে মাধ্যমিক অব্দি শুধু ছেলেদের সাথেই পড়েছি; অতএব, এখন চোখের আর দোষ কি, ব্ল্যাকবোর্ড থেকে তারা দিগভ্রান্ত হয়ে এখন শুধু সঙ্গিনীদের দিকে ধায়! ভুল বুঝবেন না, আমার সঙ্গ তারা কেউই নিতো না… ভালো কমিউটেড মেয়েরা কোনোদিন কি ক্যাবলা ছেলেদের দিকে তাকায়?

ক্লাসের পড়া বোঝার চেষ্টা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি কিন্তু ভালো অর্থাৎ, পড়ুয়া বন্ধু থাকার একটা উপকারিতা হলো, না জানতে চাইলেও কিছু শর্টকাট শেখা যায় এবং বেশ অন্তঃসারপূর্ণ আলোচনার পার্টিসিপেণ্ট হওয়া যায়। পরের বিদ্যা আপন করে এই চটজলদি পপুলার হবার কায়দাটা বেশ রপ্ত করলাম অচিরেই (বিশ্বাস করুন, তখন ম্যানেজেমেন্ট-এর কিছুই জানতাম না, শুধু ভেসে থাকার খড়কুটো ছিল)! পড়া পারা তো দূরের কথা, মাস্টারমশাই যাতে কোনো প্রশ্ন না করেন তাই জন্য আগে থেকেই যত আজগুবি প্রশ্ন ঠিক করে রাখতাম দীপ্তমান বন্ধুদের সাহায্যে। তারা ভাবতো, এই প্রশ্নটা যদি আমি করি সবাই আমাকে পাগল/ক্যাবলা ভাববে – তার চেয়ে এই বকরাটাই জিজ্ঞেস করুক আর আমরা উত্তর দোবো! আমার এই জাজ্বল্যমান বন্ধুরা অনেক ভেবে, ক্লাসের আগে আলোচনা করে এই ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করতো, আর এই শ্রীমান ফাঁকতালে কিছু ক্ষীর খেত। নারী জাতি, স্বভাবতঃই দয়াপরবশ, তারা সব কিছুর মাঝেই ভালো দেখতে পান। এক্ষেত্রেও তার কিছু প্রতিফলন ছিল, কিছু মেয়েরা ড্রাগনের লেলিহান শিখার দিকে ধাবিত পুরুষ পুঙ্গবকে বীর আখ্যা দিতো মনে মনে| স্বভাবত, যে ছেলে লাঞ্ছনা অনিবার্য জেনেও জ্ঞানের তাগিদে বার বার বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু ভুল প্রশ্ন করে, তাকে কি বীর বলা যায় না? তার ব্যর্থতায় অনেকেই বীর-রুধির-প্রবাহ দেখতে শুরু করলো। ক্যাবলা ধীরে ধীরে ছ্যাবলা এবং ক্রমে ধীমান হতে শুরু করলো… যে মেয়েটি পরীক্ষায় সবার আগে থাকতো সেও ডেকে এটা ওটা “ডিসকাস” করতে শুরু করলো|

অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করীদের একটাই ভয়, নিজেদের অপূর্ণতা যদি বা প্রকট হয়… কিন্তু দুকান কাটা যায় গ্রামের মাঝ দিয়ে, অতঃ কিম্? আমার আর কি ভাবনা? মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোলেই আমি তো সেই পুরোনো ফেলুদা (প্রদোষ মিটার? নো রিলেশনস্ প্লিজ) – তা একটু না হয় ভালো ছেলের রেলা নিলামই বা! রাজকাহিনী থেকে শরদিন্দু, সবাই বলেছেন “বীরভোগ্যা বসুন্ধরা” – হলাম না হয় ডন কিহোতে! একে ছ্যাবলা, তার ওপরে ঢ্যামনা ইয়ার দোস্ত মাথায় তোলে – সে অপরূপ ইমেজ আর নাই বা বর্ণনা করলাম!

কিছুদিন পরে বোধোদয় হলো, এই যে হঠাৎ পাওয়া যশের বেলুন টিউটোরিয়ালের পরীক্ষার খাতা দিলেই তো ফট্ করে ফেটে যাবে| যাতে মেয়েদের সামনে প্রেস্টিজ পাংচার না হয়, শুরু করলাম ক্লাস কাটার হিরোগিরি … বখে গিয়ে ফেল করার মধ্যেও একটা বীরত্ব আছে! বন্ধুরা বেদুঈনের রোল কিনে খাওয়াতে শুরু করলো আমি এলেই, আর তিনতলার বারান্দা থেকে মেয়েদের আড়চোখে চাওয়া। শপথ না করতে পারলেও, আমার বুকের ছাতি কোন এক রাজনৈতিক নেতার মতোই ফুলে উঠতো!

হঠাৎ খেয়াল করলাম – লম্বা, ছিপ্ ছিপে, চশমা পরা একটা ফর্সা মেয়ে খালি তার বন্ধুদের মধ্যে আমাদেরকে নিয়ে হাসাহাসি করে। দেখতে শুনতে ভালোই, ভাবলাম আমার হ্যাণ্ডসাম বন্ধুবরের প্রতি তার কটাক্ষ তাই বন্ধুকে ব্যাপক তোল্লাই দিয়ে কাবাব রোল হাতালাম। একটি মেয়ে আমার বন্ধু ছিল, তার বয়ফ্রেন্ড ছিল তারই স্কুলের সহপাঠী – আমরা একসাথে হেঁটে ফিরতাম কিছুটা। একদিন এই সহযাত্রী বান্ধবীটি বললো যে ক্লাসে নাকি সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, আর এইসবের মূলে ওই কনভেণ্টে পড়া লম্বা মেয়েটি! সে নাকি আমাকে ললিপপ বলে খিল্লি করে। বোঝো কেত্তন! একে ভয়ে ক্লাস কাটি, যেদিন মা কি বাবা ড্রপ করে উপরে না যাওয়া অব্দি নড়ে না – সেদিনই ক্লাস করি, তার ওপর এই গেরো!

এবারে মেয়েটির দিকে পূর্ণাঙ্গে তাকাতেই হলো! বেশ সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, অহংকারী মেয়ে – বন্ধুর সাথে মানাবে ভালোই, হয়তো একটু মাথায় উঁচু হতে পারে কিন্তু ও বড়ো ঘরের ছেলে, স্বপ্রতিভতায় মানিয়ে নিতে পারবে। তা এহেন মেয়ে আমাকে কাঠি না করলে sure বন্ধুর হয়ে ওকে ডাকতাম যাতে ওরা মিট্ করে। ক্লাসে চুপ করে বসে আছি, সবাই গুলতানি করছে, স্যার এখনো আসেনি। হঠাৎ একটা হাসির রোল উঠলো, তাকাতেই বুঝলাম আমিই খোরাক – অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে আগে কিছু বলেছিলাম তাই নিয়ে! খানিক বাদে স্পষ্ট শুনলাম ‘লালিপাপ’ … শব্দটা শুনেই রাগে কান গরম হয়ে উঠলো। আমি ফেল করলে কার বাপের কি! নিকুচি করেছে বন্ধুর সম্ভাব্য প্রেমযোগ, আজ ক্লাসের পরেই এস্পার না হয় ওস্পার করবো! ছুটির সময়ে ছেলেদের কাটিয়ে বেরোবো এমন সময়ে বন্ধু সিগারেটের কাউণ্টার দিলো – ব্যস, বৃষ্টির (থুড়ি ধোঁয়ার) জন্যে খেলা স্থগিত! বিনিপয়সায় ফোঁকা হলে, পেছনের ডোভার লেন দিয়ে বেরিয়ে গড়িয়াহাট পৌঁছে দেখি সেই মেয়েটি তার দুই বন্ধু নিয়ে গাড়ির জন্যে দাঁড়িয়ে। বনেদি “বার্মা টিক্-এ” সহসা আগুন ধরে না, সময়ে লাগে কিন্তু অন্তঃসারশূন্য আমার মতো প্যাঁকাটি দপ্ করে জ্বলে ওঠে!

তার দিকে তাকিয়ে বললাম যে তার সাথে কথা বলার আছে, বিস্মিত হলেও বন্ধুদের বলে কনভেণ্টওয়ালী রাস্তার পেছন দিকে এলো। মনে ঠিক পড়ে না কি যা তা কথা শুনিয়েছিলাম একলা মেয়েটিকে – কিন্তু মনে পড়ে তার আহত, হতবাক চোখদুটো। হঠাৎ বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ থেকে, হয়তো বা তার নিটোল গালের ওপরে চোখের ধারা লুকোনোর জন্যই! কিছু একটা আলগোছে বলে উঠে পড়েছিল চলন্ত গাড়িতে … ক্যাবলা, মানে যারা প্রত্যুৎপন্নমতি সম্পন্ন নয়, তারাও ভুল বুঝতে পারে …কিন্তু, বড়ো দেরিতে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *