আমরা কি চাই? আমরা ডাক্তার

ডঃ অনুপম ব্রহ্ম

সারাদিন হাসপাতাল বন্ধ। টিভিতে অ্যাঙ্করবাবু বলে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে। আপনার এই জুনিয়র ডাক্তারগুলোর উপর চরম রাগ হয়েছে। এটা কোনো আন্দোলনের ধরণ? সাধারণ মানুষের অসুবিধা করে এ আবার কী অসভ্যতা? এরা কী সেবা দেবে মানুষকে? তার উপর সবাই ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে, যদি আমাদের পাশে না থাকেন, তবে আপনার দরকারের সময় আমাদের পাশে পাবেন না। এটা কী ধরণের হুমকি?
প্রথম কথা, এই কথাটা ধরবেন না। এটা অভিমানের কথা। সমাজের ওপর অভিমান। রাগ করে মা’কে আমরা যেমন বলি, “তোমার কোনো কাজে আমাকে ডাকবে না”- সেই জাতীয়। আপনার অসুবিধায় আপনার কোনো ডাক্তার বন্ধু বা আত্মীয়কে ফোন করবেন। সে কোনো অবস্থাতেই “কই সে সময় কোথায় ছিলেন, তখন ফেসবুকে ডাক্তারদের সমর্থন করে কোনো পোস্ট দেন নি”- এই জাতীয় কথা বলে ফোন কেটে দেবে না। দেখবেন।

এবার আসি আপনার রাগের কথায়। আপনার আগেই ডাক্তারদের উপর একটু একটু রাগ ছিল। তার কারণ, এরা প্রচুর টাকা ফি’স নেয়। মানুষের অসহায়তার সুযোগ নেয়। কবিগুরু নচিকেতা বলেই দিয়েছেন এদের বউরা যে গয়না পরে, তাতে অনেক রক্ত। (উদারবাদী মুক্তমনা গায়কের সেক্সিস্ট মনোভাবটা ছেড়েই দিলাম। ডাক্তারের বউ মানে সে কোনো কাজ করে না। সম্পূর্ণভাবে ডাক্তারের উপার্জনের উপর নির্ভর করে আছে তাঁর শখ-আহ্লাদ। এবং আরো ভয়ানক। ডাক্তার মাত্রেই পুরুষ। সে অন্য আলোচনা…)
তো এবার ভাবুন। ডাক্তার ফি’স নেয় কখন? যখন আপনি তাঁকে প্রাইভেট চেম্বারে বা বেসরকারি হাসপাতালে দেখাতে যান। তাই তো? বেশ, তাহলে যাবেন না। যে ডাক্তারের প্রচুর টাকা ফি, তিনি, বা তাঁর সম-মানের কোনো ডাক্তার নিশ্চই কোনো না কোনো সরকারি হাসপাতাল, বা মেডিক্যাল কলেজে আছেন। ও পি ডি-তে বসেন। সেখানে আসুন। আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্পূর্ণ ফ্রি করে দিয়েছেন। মাথায় রাখুন। ফ্রি।

পড়ে নিন এক সাধারন নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গি…ধর্মে আছি, জিরাফেও আছি..

এবার সরকারি হাসপাতাল বলতে আপনার মাথায় কী ছবি এল? পিলপিল করে মানুষ ঢুকছে, ও পি ডি-র টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা একটা লাইন, ও পি ডি-র সামনে লাইন তার চেয়েও লম্বা। ওদিকে প্লাস্টিক পেতে কিছু মানুষ শুয়ে আছে। পাশে দু’টো কুকুর। ফিনাইলের গন্ধ। মাথার উপর সূর্য। ঘাম। একজন কাশতে কাশতে থু-থু ফেলল। আপনার গা’টা ঘিনঘিন করে উঠল। আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, অ্যাপোলো বা আমরিতেই যাবেন। ইন্টারনেট দেখতে বসলেন।

তাহলে কী এই সিদ্ধান্তটা আপনি নিলেন? না নেওয়ানো হল? আপনি কেন সরকারি হাসপাতালে যেতে পারলেন না? সম্পূর্ণ বিনাপয়সায় চিকিৎসা হবে জেনেও? আপনাকে তার মানে আপনার একটা অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল? হল তো?
তো এই দায়-টা কার? টাকার শকুন ডাক্তারগুলোর? না ওই পরিকাঠামোগুলো যার ঠিক করার কথা ছিল তার? বলুন।

এর পরের প্রশ্নটা আরো মারাত্মক। আপনি তো একটু টাকা খরচ করে অ্যাপোলো-তে দেখিয়ে নেবেন। কিন্তু যাদের সে উপায় নেই? যারা ওই নোংরা সরকারি হাসপাতালেই যেতে বাধ্য হবে তাদের কী হবে? তাদের কি সুস্থ পরিবেশে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নেই?

অনেককিছু শোনা যায়। সরকারি হাসপাতাল আর আগের মতো নোংরা নেই, সৌন্দর্যায়ন হয়েছে। এতগুলো সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল হয়েছে, নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে।
তালিকা আমি দিচ্ছি।
১.মেডিক্যাল কলেজগুলোর বড়-বড় গেট হয়েছে। ওয়ার্ডে ঘুরে দেখুন। প্রতি বেডে কতজন করে রোগী রয়েছে আর মেঝেতে কতজন। ওয়ার্ডে ক’টা বেড়াল, ইঁদুর। ক’টা আরশোলা। বেডের চাদরগুলো কেমন।
২.সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলোতে সুপার-স্পেশালিস্ট ডাক্তার কতজন রয়েছেন। একটা সোজা অঙ্কের হিসেব করলেও হয়। এতগুলো সুপার স্পেশালিটিতে সব বিভাগ চালাতে কতজন সুপার স্পেশালিস্ট ডাক্তার চাই, আর পশ্চিমবঙ্গে সুপার-স্পেশালিস্ট ডাক্তার কতজন রয়েছেন। এই তালিকাটা রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে পাবেন। চাইলে RTI ও করতে পারেন। বুঝবেন অঙ্কের হিসেবেও এটা অসম্ভব একটা দাবি। সুপার স্পেশালিস্ট ছাড়ুন। এই হাসপাতালগুলোতে কতজন করে স্পেশালিস্ট, নিদেনপক্ষে জুনিয়র ডাক্তার আছে-সেই দিকে দেখুন। গরমিলটা খুব সহজেই বোঝা যাবে।
৩.সুপার প্সেশালিটি বাদ দিয়ে অন্যান্য হাসপাতালে কতজন করে ডাক্তার থাকার কথা, কতজন আছে্ন?
৪.শুধু ডাক্তার দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা চলে না। নার্সিং কর্মী-র দিকে তাকান। ওয়ার্ড-পিছু কতজন করে আছেন। কতজন করে চাই। তারতম্যটা বুঝবেন।
৫.টেকনিশিয়ানদের কী খবর? প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, রেডিওলজি বিভাগ, আইসিইউ, ওটি- এগুলোতে টেকনিশিয়ান কর্মীরা অপরিহার্য। এঁরা যথেষ্ট সংক্যায় আছেন তো?
৬.নীচ থেকে উপর অবধি সব হাসপাতালে সবরকমের ওষুধ আছে? নিদেনপক্ষে এমারজেন্সি লাইফ-সেভিং-গুলো?

আপনি নিজে খুঁজে দেখুন। প্রশ্নগুলো আমি ধরিয়ে দিলাম। আর যদি আমাকে বিশ্বাস করেন, তাহলে বলি, কিস্যু নেই। মেডিক্যাল কলেজে একটা ওয়ার্ডে ডিউটিতে দু’জন পিজিটি। রোগী ভর্তি হচ্ছে দেড়শো থেকে দুশো। তার উপর এমার্জেন্সি কল। সেই দুজন ডিউটি করছে টানা ত্রিশ ঘন্টা। পেটে খিদে। ঘেমে ঘেমে ডিহাইড্রেটেড। দরকারের সময় লাইফ সেভিং কোনো ওষুধ ওয়ার্ডে পায় নি। আপনাকে কিনতে বাইরে পাঠিয়েছে। ওদিকে আপনি ভাষণে শুনেছেন, হাসপাতালে সব ওষুধ বিনা-পয়সায় পাওয়া যায়। তার উপর আপনার রোগী বেড পায় নি। আপনি আরো তিনটে হাসপাতাল ঘুরে এখানে এসেছেন। আপনার সব রাগ গিয়ে পড়ল ওই দু’জন ডাক্তারের ওপর। কারণ আপনার কাছে তারাই ওখানকার কর্তৃপক্ষ। মারামারি শুরু হল।

এইভাবেই ডাক্তার আর বাকি সমাজ শত্রু হয়ে যাচ্ছে। ওই “নেই”-গুলো নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করতে দেওয়া হচ্ছে না। আপনার নজর ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে ডাক্তারদের দিকে। মিডিয়ার সাহায্যে, হোয়াটসয়্যাপের সাহায্যে।

আজ জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির সাথে এই প্রশ্নগুলো জড়িয়ে। তারা কাজের উপযুক্ত পরিবেশ চায়, মানে সবকিছুই চায়। মানে আপনার ওষুধ, আপনার বেড সবকিছুর জন্যই তারা লড়ছে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের হস্টেলে বন্দি করে মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। তবু এরা লড়ছে। এদের পাশে থাকুন। কেউ কারো শত্রু নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *