টিউলিপ, উইন্ডমিল, ইত্যাদি..

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

‘হল্যান্ডের হালহকিকত’​-এর​ আগের পর্বে ইয়োরোপ​-ভ্রমণ সম্বন্ধে লিখেছিলাম​। তার মূল অনুপ্রেরণা ছিল যে কোন সেনগেন-অন্তর্ভুক্ত দেশে বর্ডার​-কন্ট্রোল​-হীন প্রবেশাধিকার​, আর তা নিয়ে আমার অপার বিস্ম​য়​। কিন্তু সেই লেখা ছাপানোর পরে সম্পাদক​-মশায় হাল্কা আদেশ দিলেন​, “সিরিজটা যখন হল্যান্ড​-সম্পর্কিত​, তখন বেশী এদিক​-ওদিক না ঘুরে হল্যান্ডেই মন দাও”। তাই, সেনগেন​-ভিসা থাকা সত্ত্বেও এবারের প্রবন্ধটা হল্যান্ডের গন্ডীর বাইরে বেরোতে দেব না। তবে, চিন্তা করবেন না, হল্যান্ডের অনেক ইন্টারেস্টিং গল্প আপনাদের সাথে করা বাকি আছে। তারপর আবার ইয়োরোপ​-ভ্রমণ নিয়ে ফিরে আসব​, সে সম্পাদক​-মশায় যতই বারণ করুন না কেন​!

নেদারল্যান্ডস বলতেই বেশীরভাগ মানুষের মনে আসে – টিউলিপ আর উইন্ডমিল​। তাই, সেই দিয়েই গল্পটা শুরু করি। মার্চের শেষের দিক থেকে মে মাসের মাঝামাঝি অবধি টিউলিপের সম​য়। এয়ারপোর্ট থেকে বাসে করে আধঘন্টা, আপনি পৌঁছে যাবেন কিউকেনহফ গার্ডেনে, যেখানে হরেক রকমের এবং হরেক রঙের টিউলিপের সমাহার আপনি এক জায়গায় দেখতে পাবেন​।

‘কিউকেনহফ’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘কিচেন গার্ডেন’​, কারণ এই বাগান থেকে একসময়ে হল্যান্ডের কাউন্টেসের রান্নাঘরের উপাদান সরবরাহ করা হতো। তবে, এই বাগান এখন মূলতঃ টিউলিপের প্রদর্শনীর জন্যেই ব্যবহার করা হ​য়​। আর​, আপনি যদি টিউলিপের চাষ দেখতে আগ্রহী থাকেন​, স্কিফোল এয়ারপোর্ট থেকে সাইকেল ভাড়া করে (বা, গাড়ীতেও যেতে পারেন​) লিসে-লাইডেন​-হারলেম অঞ্চলের একচক্কর মেরে নিতে পারেন​, মাঠের পর মাঠ বিস্তৃত টিউলিপের সমাহার আপনাকে নিশ্চ​য়ই মুগ্ধ করবে।

টিউলিপ নেদারল্যান্ডসের জাতীয় ফুল​, এবং বৈদেশীক নীতিতেও এর গুরুত্ব অপরিসীম​। উদাহরণ​-স্বরূপ​, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম​য়ে কানাডার সাহায্যের প্রতিদান হিসাবে প্রতি বছর নেদারল্যান্ডস থেকে দশহাজার টিউলিপ কানাডায় পাঠানো হ​য়​।

এই ফাঁকে বলে রাখি, আপনারা যাঁরা ফুল ভালোবাসেন​, এপ্রিল মাস নাগাদ টিউলিপ ছাড়াও চেরীফুলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারেন​। আমস্টেলভীনে চেরী-ব্লসম পার্ক বা কার্সেন​-ব্লোয়েম পার্ক প্রতিবছর এপ্রিল মাসে ভরে ওঠে চেরী ফুলে। আমস্টেলভীন মিউনিসিপালিটি হাউসের একদম লাগোয়া​, পাশে একটা ব​ড়ো লেক – আর তার গা ঘেঁসে ছোট্ট এই পার্ক। একটা বিকেল সুন্দরভাবে কাটানোর জন্যে খুব​-একটা খারাপ অপশন ন​য়​!

আর​, উইন্ডমিল তো নেদারল্যান্ডসের সর্বত্র​। সমুদ্র​-তীরবর্তী দেশ হওয়ার জন্যে এখানে হাওয়ার দাপট খুব​। যেমন আপনারা জানেন​, উইন্ডমিল বাতাসের শক্তিকে মেকানিক্যাল এনার্জিতে রূপান্তরিত করে। আগেকার দিনে এই উইন্ডমিল ব্যবহার করা হতো গম​-জাতীয় শষ্য ভাঙার জন্যে, আর এখন ব্যবহার করা হ​য় গ্রীন​-এনার্জি হিসাবে বা জ্বালানী শক্তির বিকল্প হিসাবে। এখন যদিও বেশীরভাগ ধাতব উইন্ডমিলই দেখা যায়​, কিন্তু আগেকার দিনের কাঠের উইন্ডমিলের আকর্ষণই আলাদা। সেই আকর্ষণের জন্যে আপনাকে যেতে হবে জানসে-স্খান্স (Zaanse Schans) কিংবা কাইকদাউনে (Kijkduin)। জানসে-স্খান্স আমস্টারডামের খুবই কাছে, সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে বাসে ১৫-২০ মিনিট মাত্র​। জান (Zaan) নদীর তীরে সুন্দর ছোট্ট একটি গ্রাম​, সেখানে একদিন সম​য় কাটালে দেখতে পাবেন চিজ ফ্যাক্টরী, উইন্ডমিল​, বা ইচ্ছা হলে নৌকাভ্রমণের ব্যবস্থাও আছে। একটা আলস্যম​য় দুপুর কাটানোর জন্যে আদর্শ জায়গা।

যেহেতু নেদারল্যান্ডস একটি সমুদ্র​-তীরবর্তী দেশ​, সমুদ্র​-প্রেমীরা এখানে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চ​য় করতে পারেন​। সেই গুপি গায়েন-বাঘা বায়েনের বিখ্যাত সংলাপের মতো, “দেখে-শুনে বেছে নিলেই হলো!” আমার প্রথম লেখায় যেমন বলেছিলাম​, দেন হাগের আশেপাশে র​য়েছে স্কেভেনিনগেন, কাইকদাউন ও ক্যাটওয়াইক​। তা ছাড়াও, হারলেম অঞ্চলে আপনি যেতে পারেন জান্দভুর্ট সী বীচে। একটা অনুরোধ​, সমুদ্রে গেলে সূর্যাস্ত না দেখে ফিরবেন না, তাহলে ঠকতে হবে।

হল্যান্ডের প্রধান একটি জীবিকা হলো ম​ৎস্য​-শিল্প​। এখানে মার্কেন, ভোলেন্দামের মতো বেশ কিছু ফিশিং ভিলেজ আছে, যেখানে বাঙালী-মাত্রেই অবশ্যই যাওয়া উচিৎ। ওই, রথ দেখা আর কলা বেচা, থুড়ি, মাছ খাওয়া, দুই-ই হবে আর কি! তা ছাড়াও, টেসেল​-আমেল্যান্ডের মতো কিছু দ্বীপ​, যেখানে যেতে গেলে জাহাজই ভরসা। কিংবা, গিথুর্ন​, যেখানে নৌকাই একমাত্র পরিবহন​। সেই গল্প নাহ​য় আরেকদিন হবে।

প্রথমেই বলেছিলাম​, নেদারল্যান্ডস নিয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং গল্প আছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *