ছবির গল্প, গল্পের ছবি -৭- সেই আফগান মেয়েটি

মিহিররঞ্জন মন্ডল

যুদ্ধ চলেছে। আফগানিস্তানের উপর বোমা ফেলছে তখন সোভিয়েত রাশিয়া। প্রাণের ভয়ে আফগানিস্তানের কিছু মানুষজন সীমান্ত পেরিয়ে  চলে এসেছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাকিস্তানে। তাদের জন্য পাকিস্তানে করা হয়েছে বেশ কিছু শরণার্থী শিবির। সেখানে তারা আশ্রয়  নিয়েছে।
     প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার স্টিভ ম্যাককারি ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের হয়ে এই যুদ্ধ কভার করতে এসেছেন। মাথায় বিরাট পাগড়ি বেঁধে তার মধ্যে বেশ কিছু রোল ফিল্ম লুকিয়ে নিয়ে আফগান সেজে শরণার্থীদের সঙ্গে ঢুকে পড়েছেন পাকিস্তানে। একদিন পেশোয়ারের কাছে নাসির বাগ শরণার্থী শিবিরের সামনে ছবি তুলছেন। এমন সময় হঠাৎ   কিছু বাচ্চার খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলেন। কাছে একটা স্কুল ঘরে মেয়েদের একটা  অস্থায়ী  ক্যাম্প। সেখানে ঢুকলেন স্টিভ। দেখলেন এই সদ্য কিশোরী পশতুন মেয়েটিকে। সমুদ্র-সবুজ চোখদুটো দেখলে কেউ ভুলতে পারবে না। মুখে রুক্ষতা, কাঠিন্য মিশ্রিত একধরনের বন্য সৌন্দর্য। দুস্থ মেয়েটির পোশাক ছিন্নভিন্ন হলেও, মাথায় লালরঙের ঘোমটায়  আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যুূদ্ধে মেয়েটির বাবা- মা মারা যাওয়ার পর, সে তার ঠাকুরমা, ভাই ও তিন বোনের সঙ্গে আফগানিস্তানের পাহাড়ি দুর্গম পথ অতিক্রম করে পাকিস্তানে চলে আসে। তারপর তার ঠাঁই হয় শরণার্থী শিবিরে। এর আগে মেয়েটি কোনদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়নি। স্টিভ তাড়াতাড়ি ওর কিছু ছবি তুলে নিলেন। সেই ছবি বার হল ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের কভারে, জুন ১৯৮৫ সংখ্যায়। অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশানালের ব্রোশিঁও এবং পোস্টারে দেখা গেল সেই ছবি। সারা পৃথিবীতে সাড়া পড়ে গেল। কিন্তু  মেয়েটির পরিচয় কেউ জানতে পারল না।

এর সতেরো বছর পরে ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক টিম সেই শরণার্থী আফগান মেয়েটির খোঁজখবর শুরু করল। স্টিভ ম্যাককারিও তাদের সঙ্গে ছিলেন। স্টিভের তোলা সেই ছবি দেখিয়ে কেউ মেয়েটিকে চিনতে পারে কিনা তা দেখার চেষ্টা করা হল। পাকিস্তানের সেই নাসির বাগ এলাকায় গিয়ে খোঁজ নিতে একজনের সঙ্গে দেখা হল যে মেয়েটিকে চেনে। সেই মেয়েটি এখন পাকিস্তান – আফগানিস্তানের বর্ডারে এক পার্বত্য অঞ্চলে থাকে। তার নাম শরবত গুলা। তার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেপুলে আছে। লোকটিকে পাঠান হল শরবতকে নিয়ে আসতে। বহু কষ্ট করে সেখানে গিয়ে সে তাকে নিয়ে এল। তাকে দেখেই স্টিভ চিনতে পারলেন এই সেই মেয়ে। টিমে এফবিআই এর একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ফটোর সঙ্গে তার চোখের তারা মিলিয়ে তিনি শরবতকে সনাক্ত করলেন।
     এখন বয়সের ছাপ পড়েছে তার মুখে। চোখদুটো কিন্তু এখনও তেমনি রয়েছে। অনেক আগেই তার বিয়ে হয়েছে রহমত গুলার সঙ্গে। রয়েছে চার কন্যাসন্তান। জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত তার নিজের দেশ আফগানিস্তানের অবস্থাও ভালো নয়। তাই মাঝেমাঝে তাকে বর্ডার পেরিয়ে ঢুকে পড়তে হয় পাকিস্তানে। সেখানেই সে থাকে বেশিরভাগ সময়।

কিন্তু পাকিস্তান কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা(  এফ আই এ) ২৬ শে অক্টোবর, ২০১৬ সালে তাকে জাল পাকিস্তানি পরিচয় পত্র রাখার অপরাধে গ্রেপ্তার করল। শরবত গুলা স্বপ্নেও ভাবেনি এর জন্য সে গ্রেপ্তার হবে। ৩৩ বছর পাকিস্তানে থাকার পরেও পাকিস্তান সরকার তার সঙ্গে এই ব্যবহার করবে। জাল পরিচয় পত্র করেছিল সে দুটি কারণে। তার শিশুদের শিক্ষাদান ও নিজের বাড়ি বিক্রি। জামিনে মুক্ত হবার পর সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন দু’সপ্তাহ পরে তাকে আফগানিস্তানে পাঠাবার ব্যবস্থা হল।
     এটা নিয়ে দারুণ শোরগোল হল চারিদিকে।  অ্যামেনেস্টি ইন্টার ন্যাশানাল এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। তখন দুঃখ প্রকাশ করে শরবতকে পাকিস্তানেই থেকে যেতে অনুরোধ করলো সেই দেশের সরকার।
     শরবত কিন্তু পাকিস্তানে আর থাকতে চাইলো না। ইতিমধ্যে তার স্বামী ও এক মেয়ে মারা গেছে। সে বলল, ” আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্য। মাত্র ছ’বছর বয়সে বাবা-মাকে  হারিয়ে এই দেশে আশ্রয় নিয়েছি। পাকিস্তানকে নিজের দেশ বলেই ভাবতাম। আমার স্বামী আর মেয়ের কবর এখানেই রইল। “
     আসরাফ গনি তখন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট। তিনি শরবতকে সসম্মানে ফিরিয়ে আনলেন তার নিজের দেশে। ভালোভাবে তার থাকার বন্দোবস্ত করলেন। তার মেয়েদেরও সুশিক্ষার ব্যবস্থা হল।
     সারা জীবন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে অবশেষে সুখের মুখ দেখল সবুজ নয়না সেই শরবত গুলা।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: