ছবির গল্প, গল্পের ছবি – ৬ বুখেনভাল্ড নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প

মিহিররঞ্জন মণ্ডল

১৯৪৫ সাল। তখন জার্মানিতে হিটলারের পতন হয়েছে। বাঙ্কারের ভিতরে ঢুকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন এই যুদ্ধোন্মাদ। একবার সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন থার্ড রাইখের আয়ুষ্কাল নাকি হাজার বছরেরও বেশি হবে। দেওয়ালের লিখন তখন পড়তে পারেননি হিটলার।  কয়েক বছরের মধ্যেই এই স্বৈরাচারী শাসকের স্থান হল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

বিশ্বের সমস্ত দেশকে পদানত করে সারা পৃথিবীর অধীশ্বর হওয়ার অলীক স্বপ্ন দেখেছিলেন এই উন্মাদ। তার জন্য যত নিচে নামতে হয় নেমেছিলেন মনুষ্যত্বের বিন্দুমাত্র  তোয়াক্কা না করে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিশেষ করে ইহুদিদের বন্দি করে রেখেছিলেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে।

যে নারকীয় পরিবেশের মধ্যে থাকতে বাধ্য হতেন বন্দিরা তা কল্পনায় আনা যায় না। তাঁরা প্রায় কিছুই খেতে পেতেন না। তার উপর অমানুষিক পরিশ্রম তাঁদের দিয়ে  করানো হত। পরে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে তাদের নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হত।

তার জন্য জার্মানি, পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় করা হয়েছিল অসংখ্য বন্দিশিবির। খোদ জার্মানিতেই ছিল তিন তিনটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প–দাচাউ, বুখেনভাল্ড আর জাকসেন হাউজেন।

১১ই এপ্রিল, ১৯৪৫ বিকেলবেলায় আমেরিকার থার্ড আর্মির জেনারেল জর্জ প্যাটন তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে ঢুকলেন জার্মানির ওয়াইমারের কাছে বুখেনভাল্ড ক্যাম্পে। সঙ্গে লাইফ পত্রিকার প্রখ্যাত চিত্রসাংবাদিক মার্গারেট বোরক্ হোয়াইট। ক্যাম্পের ভিতরের ছবি তিনি তুলবেন। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ক্যাম্পের গেট দিয়ে ঢুকেই যে দৃশ্য মার্গারেটের  চোখে পড়ল তাতে তিনি শিউরে উঠলেন। তাঁর মতো ঝানু চিত্রসংবাদিক এটা সহ্য করতে পারলেন না।

তাড়াতাড়ি চোখে হাত চাপা দিলেন। সামনে এক বিশাল স্তূপ। তাতে গাদাগাদি করে ঠাসা বন্দিদের অসংখ্য মৃতদেহ। কিছুক্ষণ পরে মার্গারেট ধাতস্ত হয়ে হাতে তুলে নিলেন তাঁর ক্যামেরা। নাৎসিদের অত্যচারের বীভৎস ছবিগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে লাগলেন।

বুখেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে অসংখ্য ইহুদি, শ্লাভ, পোল ও রোমানি মানুষজনকে ধরে রাখা হয়েছিল এক অবর্ণনীয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এক একটা ঘরে অনেক বন্দি একসঙ্গে থাকত। ঠিকমতো খেতে না পেয়ে ও অমানুষিক পরিশ্রমে বন্দিরা মারা পড়ত। তখন তাদের লাশগুলো ফেলে রাখা হত ক্যাম্পের কোন খোলা জায়গায়। পরে সেই লাশের গাদা পোড়ানো হত ক্রিমেটোরিয়া ওভেনে।

এই ক্যাম্পের প্রায় ৫৬,৫৪৫ জন বন্দিকে এভাবে মেরে ফেলা হয়েছিল। শুধু তাই নয় যে সমস্ত অসহায় মহিলাকে এখানে ধরে আনা হয়েছিল তাঁদের যৌনদাসী হিসাবে এখানে কাজ করতে বাধ্য করেছিল এই সব নর পিশাচেরা। মনুষ্যত্বের এহেন অবমাননা কল্পনাও করা যায় না। জার্মানির পরাজয়ের পর সমূলে ধ্বংস হয়েছিল নাৎসিবাদ। ন্যুরেমবার্গের সামরিক বিচারে প্রাণদন্ড হয় অনেক নাৎসি নেতার। কিন্তু এরা যে অত্যাচার সাধারণ মানুষের উপর নামিয়ে এনেছিল তার নিদর্শন থেকে যাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায়।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *