আমি ডাক্তার। অসুরের অবতার..

  সুমনা মন্ডল

গত এক সপ্তাহ ধরে সমস্ত পাঠকগণ সংবাদের শীর্ষে চিকিৎসক-আন্দোলনের ‘নাটক/নেকামো’ দেখতে দেখতে ক্লান্ত জানি।তবুও বাস্তবে ‘মেডিক্যাল’ শিক্ষা ঠিক কেমন জানানোর লোভ সামলাতে পারলামনা।

 কিন্তু অপটু মস্তিস্ক,কি দিয়ে শুরু করি আচ্ছা, শুনলাম 1 টা ডাক্তার বানাতে 25 লাখ খরচ হয়। এটা নিয়েই একটু গবেষনা হয়ে যাক।আমাদের এবছরে admission fees লেগেছে 9500। যেটা কল্যাণীর মতো স্ট্যান্ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজর প্রায় সমান কখনো বা বেশি। আর যাদবপুর!ওদের এটা 4বছরের খরচ!! এই টাকাটা কার ট্যাক্সের টাকা থেকে আমাদের অভিভাবক আনে জানতে পারিনি। আর ইঞ্জিনিয়ারদের বেশিরভাগটাই ‘বাইরে পালায়’ নইলে সরকার চাকরি দিতে পারেনা!!

এরপর আসি বইয়ে। আমাদের মেডিসিনের বই Harrison-র দাম 9,000। কিনতে হয় নিজেদের। লাইব্রেরি থেকে একসাথে সর্বাধিক 2টি বই পাওয়া যায় আর বিষয় সংখ্যা 21।

 এবার আসি bone-set। সাধারণ ভাষায় কঙ্কাল। হ্যাঁ, ওটা আমাদের প্রত্যেকের একান্ত নিজস্ব।বর্তমান দাম 15,000-20,000(কলেজ ভেদে )। কিনতে হয় নিজেদের!! আর 20,000টাকার মূল্য আমাদের কাছে সমানই অর্থাৎ এতে কোনো বাবার মেয়ের যৌতুকের ‘হাতের-কানের’ হয় আর কোনো বাবার মেয়েকে ডাক্তার করার স্বপ্নপূরণ।

এরপর আসি শিক্ষনীয় বিষয় নিয়ে। আমাদের মোট বিষয় সংখ্যা 21। তার মধ্যে প্রথমে শিখানো হয় pre-clinical যার মূল কথা একজন সুস্থ মানুষের শরীর কেমন হওয়া দরকার। তারপর para-clinical তাতে শেখায় পরীক্ষা করা। আর তারপর clinical সেটা রোগী-ডাক্তার সম্পর্ক। এরপর আসি এতে কি খরচ হয়।anatomy র দেহসংরক্ষনে খরচ। যদিও বাজারে সংরক্ষিত প্রজাপতি দেওয়া চাবির রিং সস্তায় পাওয়া যায়। এরপর আসি পরীক্ষার বিষয়ে। শেখানো হয় urine-test। সেটা যে কেনা হয়না সকলেরই জানা। এরপর blood-test।যোগান আসে রুগীর report তৈরীর পর অতিরিক্ত অব্যবহৃত রক্ত থেকে।আমাদের হবু ডাক্তারদের জোড়া হাতের জন্য gloves দেওয়ার মতো অপব্যয় সরকার করেনা। তাই খালি হাত। আমি যখন teacher কে জিজ্ঞাসা করলাম যে এগুলো তো ইনফেক্টেড blood। সংক্রমনের ভয় নেই। পাতি বাংলায় উত্তর পেলাম ‘তুই না ডাক্তার। কিচ্ছু হবেনা!!’ আর physiologyর রক্ত নিজের হাত থেকে বার করে নিতে হতো।

অনেকের অভিযোগ ডাক্তাররা নার্সিংহোম করে। কিন্তু প্রশ্ন তারা duty বা ট্যাক্স কোনটা ফাঁকি দেয়?? আমাদের মতো মিডলক্লাস লোক নার্সিংহোমের নিন্দা করে কিন্তু হসপিটালেও থাকতে পারেনা। কারন? বেড নেই! দোষ কার?? সবাই নিজের বাচ্চাদের পড়ায় বেসরকারি বিদ্যালয়ে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তার!তারা তো কসাই।হাসপাতাল খোলা কিন্তু চিকিৎসকরা ইস্তফা দিচ্ছেন। দাবি,’আমরা কসাই। মানুষ মারি।আর আমাদের গাফিলতিতে কেউ মারা যাবেনা। ‘হয়তো অনেক নিরাপরাধ মানুষকে এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে। কিন্তু কতটা চেষ্টার পর পাওয়া 1টা চাকরি মানুষ ছাড়ে ভাবুন। আমার অভিজ্ঞতা এখন কম। কিন্ত এটা বিশ্বাস করিনা যে রুগীদের মেরে ফেলা হয়। আমাদের teacherদের বলতে শুনেছি ‘তুমি তোমার বাবাকে যেভাবে সমস্যাটা বলেছ সেভাবে বল’!! খুবই নিষ্ঠুর কথা??

 কি লিখবো ভেবে অনেকটাই লিখে ফেললাম। শুধু 1টাই অনুরোধ ‘SAVE THE SAVIORS’.Next to God চাইনা। শুধু মানুষ হিসাবেই দেখুন। লড়াই হোক পরিকাঠামোর বিরদ্ধে। ডাক্তার:রুগী=1:1800 র বিরুদ্ধে।নইলে সেই অবস্থা আসছে ‘ডাক্তারদের উপর হামলা/ফাঁকা হাসপাতাল সামলা’।

আমি জানি একটা শিক্ষাব্যবস্থার খরচ পরিকাঠামো, শিক্ষক এইসব কিছু মিলেই হয়। সেই 25লাখি লেখাপড়াটা নিয়ে এবার একটু বলি।

  আমাদের কলেজে 2টি ক্যাম্পাস। 1st year র ক্লাস হয় পুরাতন বিল্ডিং। বেশ বড় ক্যাম্পাস শুরুটা পাওয়া গেলেও শেষ কোথায় ‘ধরতে পারবেন না’। কারণ পার্শবর্তী বস্তিতে মিশে গেছে পাঁচিলের অভাবে।তাতে আমাদের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু সেখান থেকে 5-6টা করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কিছু মা শুকরেরা আসা যাওয়া করে হাসপাতালের ক্যাম্পাসে।

ওসব নিরীহ পশু নিয়ে আর কথা বাড়াবোনা। রুগীদের বসার জন্য 1টা গাছের তলায় বাঁধানো জায়গা আছে। কিন্তু রুগীদের পাশাপাশি সেখানে প্রকৃত ‘বহিরাগত’র আড্ডা বসে।

আমাদের ক্লাসের সময়সূচির মাঝে 1ঘন্টা break। এইসময়টা কলেজেই কাটিয়ে নিতাম যাওয়া আসার কষ্ট না করতে। যেদিন বন্ধুরা আসতোনা সেদিন আমি একা।বাইরে একা বসা সুখকর নয় বুঝে (পূর্বোল্লিখিত ব্যক্তিগনের ধুম্রোপান সহ্য হতনা।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তারা যাওয়ার পর সেখানে কালো কাঁচের বোতল পড়ে থাকতো) নিরাপদ জায়গা বেছেছিলাম dissection hall। তাছাড়া break র পর এই ক্লাসটাই থাকত।কেউ হয়তো বলবেন পালিয়ে গেলেন! কি করবো। ভারতে জন্মে যে এটুকু মানিয়ে নিতে হয় জানি।( অনেকে বলেন ডাক্তারদের সাথে এমনটাই হওয়া উচিত। আজ বলে বসবেনা যে মেয়েদের সাথেও এমনটাই হওয়া উচিত। সমাজে মেয়েরা ডাক্তারের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ)

  Dissection hall মানে হল যেখানে anatomyর শবব্যবচ্ছেদ টা মৃতদেহের সাথে একাই বসে থাকতাম। জানতাম তারা জ্যান্ত মানুষের মতো বিপজ্জনক নয়। 2-4দিন এভাবে ঠিকই চলেছিল। তারপর 1দিন এলো 1টা কালো কুকুর। তাড়িয়ে দিলাম। পরদিন আমার আগেই এসে গেছে দেখছি। আর ওই বডির নীচে রাখা ডাস্টবিন থেকে খাচ্ছে।তাড়ালাম। পরদিন একই!খাচ্ছে!তাড়াতে গিয়ে দেখি জ্বলন্ত রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে আমাকে!! 1টা বড় হল, 5টা মৃত আর 1টা জীবিত মেয়ে…দৃশ্যটা কল্পনা করুন। ওই বডির ফরমালিনের ঝাঁজে আমাদের চোখ জ্বালা করে। সেই বডি যদি কুকুর খায় তবে আমাকে আক্রমণ অসম্ভব কি। চুপ করে ভয়ে বসে থাকতাম,না তাকিয়ে। আপনারা হয়তো জানেন আমাদের generation সেলফিম্যানিক, কিন্তু কখনো কাউকে dissection এর সেলফি দিতে দেখবেননা। কারণ আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি।যে পরিকাঠামো হাসপাতালে কুকুর ঢোকা বন্ধ করতে পারেনা তাদের কাছে সুরক্ষা চাওয়া নিতান্তই হাস্যকর!

 প্রসঙ্গত আসি ওল্ড বিল্ডিংয়ের ওয়াশরুম এর গল্পে। ভগ্নপ্রায় দরজা লক হয়না। আর ভেতরটা দেখলেই বোঝা যায় প্রতিষ্ঠার আদিতেই ইহা সৃষ্টি।ভাবতে পারেন এই আমরাই ফ্যামিলি প্রজেক্টএ গিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লোককে বলি শৌচাগার পরিষ্কার রাখবেন!!

  এবার আসি আমাদের নিউ বিল্ডিং এ। নাঃ,আমাদের ক্লাসরুমের পিছনে খুব কমই খরচ। কারণ,আমাদের ক্লাস হল সেই হসপিটাল যেটার সবাই নিন্দা করে। আর আলাদা করে 2টি রুম আছে তাতে Mbbs এর 3টি বর্ষ আর nursingর ক্লাস হয়।adjust নিজেদের দায়িত্ব। ধরুন 2টি রুমে ক্লাস চলছে।দুর্ঘটনাবশত আরো কারো ক্লাস আছে সেসময়। তখন ডিপার্টমেন্টাল কোনো ছোটো রুমে কেউ বসে,কেউ দাঁড়িয়ে,কেউ দেওয়ালে,কেউবা লোকের গায়ে ঠেস দিয়ে ক্লাস করে। কিন্তু হাসপাতালে নতুন নতুন বিল্ডিং হচ্ছে। নাঃ, আমাদের জন্য রুম না;রুগিদের জন্যই।

25লাখ খরচ যে হওয়া সম্ভব আমিও বিশ্বাস করি। আমার বাড়ির সামনের রাস্তাগুলোই তো কত কোটির প্রকল্প ছিল। যদিও 2বছর বয়েসের আগেই পাথর বার করে হাসছে…

  1টা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।কত খরচ তার পিছনে? আগের বছরের যাদবপুরের campusing র খবর নিলে পাবেন 42লাখ pakage এ কয়েকজন এখন অন্য রাজ্যে।এত খরচ করে পড়িয়ে তারা যে চলে যাচ্ছে তাতে অভিযোগ নেই। কেন? অবশিষ্ট ছাত্র যদি দাবি করে ওরা নেই তো আমাদের দাউ!! আমার মাধ্যমিকের সময় মনে পড়ে পাশের মেয়েটা আমাকে ইংরেজি পরীক্ষার দিন জিজ্ঞাসা করেছিল নামটা কোনখানে লিখবো!! *1st দিন বাংলাপরীক্ষা দিয়েছে সে। হ্যাঁ, এটাই পরিস্থিতি। যারা স্কুলের সাথে যুক্ত আছেন এটা জানেন পাসমার্কসটা দেওয়ার চেষ্টা করে সব পরীক্ষক। বাড়ছে পাশের হার, তাতেই সাক্ষরতা। তারপর,মেয়ে হলে 18বছর 1দিন এ বিয়ে আর ছেলে হলে বেকারত্ব। তুমি স্কুলে কি শিখছ তাতে কি আসে যায়। বেশি শিখলে 2দিন পর অনশনে বসবে যে চাকরির আসায়!!স্কুলে যাও মিড ডে মিল খাও আর পাসের হার বাড়াও। আর মেয়েদের সুস্বাথ্যের জন্য iron tablet, কৃমির ওষুধ; কৌটো থেকে হাতে দিয়ে দেওয়া হয় 2টো, রাতে খাবে/7দিন পর আর একটা। কোনো ওষুধ প্যাকেটর উপর লেখা থাকে দেখবেন cold and dry সংরক্ষনের জন্য!

প্রসঙ্গত মনে পড়লো ছোটবেলায় প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে একটা বই পড়েছিলাম। তাতে কর্কটি নামে 1জনের উল্লেখ ছিল যে নাকি কর্কট(ক্যান্সার) আর কলেরার চিকিৎসা জানত। কিন্তু শব ব্যবচ্ছেদের জন্য ফেলে দেওয়া দেহ সংগ্রহ করত।তাতে মানুষের ধারণা হয়েছিল সে রাক্ষসী,নরমাংস খায়। ফল? পুড়িয়ে মেরেছিল। একটা সময় ছিল যখন বসন্ত রোগ মহামারী রূপে আসতো। সে সময় যদি ডাক্তার জেনার এর গো-বসন্তর পুঁজ নিয়ে শরীরে ইনজেক্টের বিরুদ্ধে সন্দেহের বশে তাকেও শাস্তি দেওয়া হতো!!

আমাদের শরীর তো ১ টা অদ্ভুত সৃষ্টি। হাঁটতে হাঁটতে পা ফসকে মাথায় আঘাত!মৃত্য।জীবন-মৃত্যুর মধ্যে কতটুকু ব্যবধান কারোই তো অজানা না। আমরা বড়জোর চেষ্টা করতে পারি।সাফল্যর আসা করতে পারি। কিন্তু তার জন্য তো সমস্ত স্তরের মানুষের সংবেদনশীলতা চাই। হয়তো কালক্রমে 1:1800 কমার সাথে মৃত্যু হারও কমবে…নইলে গণপ্রহার আর তার প্রতিবাদে কর্কটির মতোই হারিয়ে যাবে আর 1টা যুগ! হারিয়ে যাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপনকারী মানুষসহ আরো অনেক ব্যক্তিত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *