Home » ছবি-কথা » ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী শাসক বেনিতো মুসেলিনি

ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী শাসক বেনিতো মুসেলিনি

না, অনেক চেষ্টা করেও তাঁর শেষরক্ষা হল না। জনরোষ এড়াতে ইতালির ত্রাস মুসোলিনি শেষ চেষ্টা করলেন পালাতে।পালাতে গিয়ে লেক কোমোর কাছে ডঙ্গো গ্রামে তাঁরা ধরা পড়ে গেলেন কম্যুনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে তারপর

মিহিররঞ্জন মন্ডল

না, অনেক চেষ্টা করেও তাঁর শেষরক্ষা হল না। এবার ইতালি ছেড়ে পালাতে হবে। মুসোলিনি সুইজারল্যান্ডের সীমান্ত দিয়ে পালাবেন বলে ঠিক করলেন। সঙ্গে কয়েকজন অনুচর ও তাঁর রক্ষিতা ক্লারেত্তো পেতাচ্চি। এই সুন্দরী মহিলাকে কোনদিনই স্ত্রীর মর্যাদা দেননি মুসোলিনি। পালাতে গিয়ে লেক কোমোর কাছে ডঙ্গো গ্রামে তাঁরা ধরা পড়ে গেলেন কম্যুনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে। মুসোলিনি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের তারা গুলি করে মারল। তারপর তারা মৃতদেহগুলো নিয়ে এল মিলানে। ওখানে শহরের পিজ্জেল লরেটো  স্কোয়ারে প্রকাশ্য স্থানে একটা সারভিস স্টেশনের মাথায় লোহার গার্ডারে দড়ি বেঁধে মৃতদেহগুলো টাঙ্গিয়ে দেওয়া হল। পাদু’টো উপরে করে আর মাথাটা নিচের দিকে ঝুলিয়ে। বহু মানুষ তখন সেখানে জড়ো হয়েছে। মৃত অত্যাচারী স্বৈরশাসকের উপর এতদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তারা উগরে দিল। বেনিতো মুসোলিনি আর ক্লারেত্তো পেতাচ্চির মৃতদেহ হাতের কাছে পেয়ে জনসাধারণ আশ মিটিয়ে শুরু করল চরম অবমাননা।  মৃতদেহগুলো উপরে চলল গুলি, লাঠি আর জুতোপেটা। ওদের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল কেউ কেউ। 

এক অশীতিপর বৃদ্ধা এসে হাজির হলেন সেখানে। ওখানে ভিড় করা মানুষজনদের সরে যেতে বললেন। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা ছোট রিভলবার বের করলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে একেবারে ক্লোজ রেঞ্জ থেকে বেনিতো মুসোলিনির মৃতদেহে পরপর তিনটি গুলি করলেন। চিৎকার করে বললেন  “একটা আমার বড় ছেলে, একটা আমার মেজ ছেলে আর একটা আমার ছোট ছেলের জন্য। ” তারপর ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বৃদ্ধার তিন ছেলেকেই নির্মমভাবে হত্যা করেছিল একসময় মুসোলিনির ব্ল্যাক শার্ট বাহিনী।

কে এই স্বৈরাচারী শাসক? কেনই বা সাধারণ মানুষের এত ক্ষোভ তাঁর ওপর আছড়ে পড়েছিল? বেনিতো মুসোলিনি ইতালির ফোরলি শহরের একগ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা আলেসান্দ্রো মুসোলিনি ছিলেন পেশায় কামার। মা রোজা সংসার চালাতে শিক্ষিকার কাজ নিয়েছিলেন গির্জার ধর্মীয় স্কুলে। পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে সমাজতন্ত্রের তখন জয় জয়কার। বেনিতো মুসোলিনির বাবা ছিলেন বামপন্থী ভাবধারার মানুষ। মুসোলিনি নিজেও তখন সমাজতান্ত্রিক মতবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাই পড়াশোনা  শেষ করে মাত্র উনিশ বছর বয়সে সমাজতন্ত্রের পাঠ নেবার জন্য গেলেন সুইজারল্যান্ডে। সেখানে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে আবার ইতালিতে ফিরে এলেন। যোগ দিতে বাধ্য হলেন ইতালির সৈন্যবাহিনীতে। তারপর তার মেয়াদ শেষ হবার পর শিক্ষকতার সঙ্গে  কাগজে রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করে দিলেন। সেইসঙ্গে ইতালির সোস্যালিস্ট পার্টিতেও যোগ দিলেন। এইসময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। ইতালির সোস্যালিস্ট পার্টি ইতালির সরকার এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক এটা চাননি। কিন্তু এর জন্য মুসোলিনি স্যোসালিস্ট পার্টি ছেড়ে দিয়ে সরাসরি  সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুূদ্ধে চলে গেলেন। যুদ্ধে ইতালির প্রচন্ড ক্ষয়ক্ষতি হল। দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ল।

মুসোলিনি এই সুযোগটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তাড়াতাড়ি  কিছু সঙ্গীসাথিদের নিয়ে গড়ে তুললেন ‘ ন্যাশানাল ফ্যাসিস্ট পার্টি।’ এই পার্টির বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে  পড়ল সারা ইতালিতে। গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে এই মতবাদে আকৃষ্ট করার কৌশল তাঁর ভালই জানা ছিল। দেশের যত সরকার বিরোধী,  চোর, ডাকাত, গুন্ডাদের নিয়ে তৈরি  হল তাঁর আধা সামরিক ব্ল্যাকশার্ট বাহিনী। এদের নিয়ে মিছিল করে রাজধানী রোমের দিকে এগিয়ে গেলেন। ফলে তখনকার ইতালির সম্রাট ভিক্টর  ইমানুয়েল ১৯২২ সালে মুসোলিনির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হলেন।     ক্ষমতা হাতে নিয়ে মুসোলিনি হয়ে উঠলেন ইতালির সর্বেসর্বা। প্রাক্তন সেনা কর্মী  থেকে আরম্ভ করে দেশের সুশীল সমাজের বেশকিছু প্রতিনিধি, বিক্ষুব্ধ সোস্যালিস্ট, দেশের ধনী সম্প্রদায় ও চোর, গুন্ডা, বদমায়েশদের সবাইকে নিজের দিকে টেনে আনলেন। ইতালিকে পরিণত করলেন একটা পুলিসি রাষ্ট্রে। জনসাধারণের স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষমতা রইল না। দেশের সংবাদপত্রগুলোকে কব্জা করে নেওয়া হল। ট্রেড ইউনিয়নগুলে বাতিল করে দেওয়া হল। এমন কী দেশের মহিলাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার বন্ধ করে দেওয়া হল। এদিকে ইতালির শিল্পপতি ও জমিদারদের প্রচুর সুযোগ  দেওয়া হল। সাধারণ মানুষের সুযোগ সুবিধার দিকে নজর দেওয়া হল না। কেউ এটা নিয়ে প্রতিবাদ করলে তার উপর ব্ল্যাকশার্ট বাহিনী অকথ্য অত্যাচার করত। এইভাবে দীর্ঘ বাইশ বছর চলল তার ফ্যাসিস্ট রাজত্ব। জনসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। মুসোলিনির বিরুদ্ধে একটা চাপা ক্ষোভ তাদের ছিল অনেকদিন ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের দোসর হয়ে উঠলেন এই যুদ্ধবাজ। কিন্তু জার্মানির পতনের পর তাঁরও পতন হল।

জনরোষের ভয়ে ইতালি ছেড়ে পালাতে গিয়ে পথে জনসাধারণের হাতেই ধরা পড়লেন। আর তার পরের ঘটনা আগেই বলা হয়েছে।     স্বৈরাচারী শাসককে মানুষ কখনও ক্ষমা করে না। একসময় তার স্থান হয় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। 

(ছবির গল্প, গল্পের ছবির অংশ)  

আপনার মতামত:-