ধর্মে আছি, জিরাফেও আছি..

অগ্নিভ সেনগুপ্ত​

এই সপ্তাহে ‘হল্যান্ডের হাল​-হকিকত’​-এ আমস্টারডাম নিয়ে লিখব ঠিক করে রেখেছিলাম​, মোটামুটি একটা মাইন্ড​-ম্যাপও তৈরী ছিল​। কিন্তু ঠিক তখনই আমার জন্মস্থান কলকাতায় ঘটে গেল এক নারকীয় ঘটনা। এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ডাক্তার বনাম পেশেন্ট পার্টির বচসা প্রায় দাঙ্গার আকার ধারণ করলো। রোগীর মৃত্যুতে ডাক্তারকে দোষারোপ​, হেনস্তা, এমনকি মারধর দুর্ভাগ্যজনকভাবে নতুন কোন ঘটনা নয়​। কিন্তু প্রায় দুশো লোক এসে হাসপাতাল ঘিরে ফেলে এমন সন্ত্রাস তৈরীর আবহ আগে কখনো ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। তার ওপরে সরকারী নিষ্ক্রিয়তা এবং সরকারীপক্ষের আনপার্লামেন্টারী মন্তব্য আগুনে ঘি ঢেলেছে। দুদিন আগেও বেশীরভাগ সরকারী হাসপাতালে ধর্মঘট​। এমারজেন্সি ব্যবস্থা ব্যহত হ​য়নি বলেই খবর আছে, কিন্তু সাধারণ জনগণকে চুড়ান্ত অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত​। আমার ব্যাক্তিগত মতামত​, এই অরাজকতার পিছনে মুখ্য অবদান সরকারের​, বা যদি আর-একটু ম্যাগনিফাই করা যায়​, ভারতবর্ষের বেশীরভাগ সমস্যার পিছনেই প্রধান কারণই সরকারী গাফিলতি।

পড়ে নিন একজন ডাক্তারের কলম থেকে… আমরা কি চাই? আমরা ডাক্তার

সেই চিন্তা মাথায় আসতে ভাবলাম​, একজন বোকা নাগরিক হিসাবে নেদারল্যান্ডসের সরকারী ও সমাজব্যবস্থার সাথে ভারতের ব্যবস্থার​ একটা তুল্যমূল্য আলোচনা করলে কেমন হ​য়​? আমি কোন রাজনৈতিক বোদ্ধা নই, তাই আমার পর্যালোচনার মূল আধার একজন সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গিতে। সেই Wednesday সিনেমার নাসিরুদ্দিন শাহের ভাষায় – ‘A stupid common man’.

ভারতবর্ষে বরাবরই রাজনীতির সাথে ধর্ম সংপৃক্ত​। এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা ভোট দেন শুধুমাত্র প্রতিনিধির জাত বা ধর্ম দেখে, তিনি কি কাজ করেছেন বা করতে পারেন​, তা দেখে ন​য়​। এই আশায়​, আমার জাত বা আমার ধর্মের প্রতিনিধি পার্লামেন্টে গিয়ে হ​য়তো আমার কথাই বলবে। এখন আবার নতুন ট্রেন্ড হ​য়েছে, মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর নামে মানুষ ভোট দিচ্ছেন​। আমাদের ক্ষমতা শুধুমাত্র আমার লোকাল এম​-পি বা এম​-এল​-এ নির্বাচন করা, মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষমতা যে আমাদের নেই, সেটা অনেকেই বুঝেও বোঝেন না।

এখন গোটা বিশ্বেই পপুলিস্ট রাজনীতির রমরমা, সে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ইলেকশন থেকে ব্রেক্সিট হ​য়ে ভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চেও প্রবেশ করেছে। সেই হাওয়া নেদারল্যান্ডসেও বইছে। এখানে পার্টি অফ ফ্রিডম (Partij voor de Vrijheid – সংক্ষেপে পি-ভি-ভি) সেই রাজনৈতিক মতাদর্শের ধারক ও বাহক​। অন্যান্য পপুলিস্ট কনসার্ভেটিভ দলের মতোই তাদের প্রচারের মূল বিষ​য় – সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপন্নতা। যাক​, সেই আলোচনা এই লেখার প্রধান উপজীব্য ন​য়​।

আমার উদ্দেশ্য একজন সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় ও ডাচ সমাজের একটি তুল্যমূল্য পর্যালোচনা। কনস্টিটিউশন অনুযায়ী ভারত একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র​। অর্থাৎ, “নানা ভাষা, নানা মত​, নানা পরিধান​, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান​”। নেদারল্যান্ডসও তাই, সমাজতন্ত্র এই দেশের প্রধান রাজনৈতিক চিন্তন​।

সমাজতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য – ব্যক্তি-মালিকানার উচ্ছেদ এবং সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রসার​। অর্থাৎ, এমন একটি সামাজিক​-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সম্পদ ও অর্থের মালিকানা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক​। নেদারল্যান্ডসে ডাক্তারদের কোন প্রাইভেট প্র্যাকটিশের ব্যবস্থা নেই। আর কোন পাড়ার মোড়ের ঔষধের দোকানও নন​-এক্সিস্টেন্ট​। ভারতীয় বন্ধু-মাত্রেই জিজ্ঞাসা করবেন​, “এ বাবা! তাহলে অসুখ​-বিসুখ করলে কি করব​?” প্রথমেই যেটা করতে হবে, সেটা হলো একটা হেল্থ ইনশিওরেন্স​। সেটা নিয়ে আপনাকে আপনার নিকটবর্তী জেনারেল প্র্যাক্টিশনারের কাছে রেজিস্টার করতে হবে। আর​, তিনি হবেন আপনার যে কোন মেডিক্যাল প্র​য়োজনের প্রথম যোগ​। যদি তিনি মনে করেন যে আপনার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্র​য়োজন আছে, উনি আপনার হ​য়ে সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন​। আর হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। যা খরচ​-খরচা, সব বহন করবে আপনার ইনশিয়োরেন্স কম্পানী।

অবশ্যই কিছু নিয়মকানুন আছে, যেমন কিছু চিকিৎসা বেসিক ইনশিয়োরেন্সের আওতায় আসে না, চিকিৎসার প্রাথমিক কিছু খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে ইত্যাদি, কিন্তু ভারতবর্ষে যেমন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের কোন ব​ড় রোগ হলে ধনে-প্রাণে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়​, সেটা এখানে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও একইভাবে এখানে প্রাইভেট স্কুলের সংখ্যা নগন্য​। কিছু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অবশ্যই ব্যক্তিগত মালিকানাভুক্ত​, কিন্তু বাকি সব স্কুলই সরকারী। তবে, এখানে সরকারী স্কুলের মান বেশ উচ্চমানের​। একটা সাধারণ পরিসংখ্যান দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। ভারতবর্ষের জনসংখ্যা ১.৩২ বিলিয়ন​, আর শিক্ষার বাজেট ১৪ বিলিয়ন ডলার​। সেখানে নেদারল্যান্ডসের জনসংখ্যা ০.১৮ বিলিয়ন​, আর শিক্ষার বাজেট ৪২ বিলিয়ন ডলার​। সহজেই অনুমেয়​, প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অন্ততঃ পরিকাঠামোগত ভাবে নেদারল্যান্ডস অনেক এগিয়ে।

এবার আপনি বলবেন​, নেদারল্যান্ডস বড়লোক দেশ​, তাই অতো খরচ করতে পারে। তাহলে আর​-একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক​, নেদারল্যান্ডসের জি-ডি-পি ৯১৪ বিলিয়ন ডলার​, যেখানে ভারতের জি-ডি-পি ২৭১৬ ট্রিলিয়ন ডলার​​, মানে প্রায় তিনগুন​।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়​? কেন সুলভে ভালো মানের চিকিৎসা বা উচ্চ মানের শিক্ষা ভারতে দুর্লভ​? প্রথমত​, জনসংখ্যা ও আকার​। ভারতের জনসংখ্যা নেদারল্যান্ডসের ৭৭ গুন​, আর আকারে প্রায় ৭০ গুন​। এতব​ড় একটা দেশকে এক সুতোয় বাঁধা খুব​-একটা সহজ ব্যাপার ন​য়​।

দ্বিতীয়ত​, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ​, ভ্রষ্টাচার​। সরকারী বাজেটের একাংশ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সরকারী আমলাদের পকেটে গিয়ে ঢোকে।

পড়ে নিন …স্বাস্থব্যবস্থা অচলায়তন – সমাধান আশু প্রয়োজন

নেদারল্যান্ডসে দুর্নীতিপ্রবণ রাজনৈতিক হ​য়তো আছেন​, আমার জানা নেই, কিন্তু সিংহভাগ মানুষের সরকারের প্রতি বিশ্বাস আছে। সাধারণ মানুষ যে তাদের উপার্জনের একাংশ সরকারকে ট্যাক্স দিচ্ছেন​, তারা জানেন যে তাদের বিপদে সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে। যেমন​, কারোর যদি চাকরী চলে যায়​, প্রথম তিনমাস সরকার থেকে তাকে তার বেতনের ৯০%, আর তার পরের ছ​য়মাস বেতনের ৭০% সরকার থেকে দেওয়া হ​য়​। ১৮ বছর অবধি অবৈতনিক শিক্ষা, প্রায় বিনামূল্যে জীবনদায়ী চিকিৎসা, পরিচ্ছন্ন পানীয় জল​, পরিস্কার রাস্তাঘাট – সব সরকারী ব্যবস্থায়​। নেদারল্যান্ডসেও জাতিবিদ্বেষ আছে (পি-ভি-ভি-এর উত্থান তার প্রমাণ​), নেদারল্যান্ডসেও পলিটিক্যাল বিরোধ আছে, মাঝেমাঝে এখানেও ধর্মঘট হ​য় – কিন্তু সব রাজনৈতিক একটি ব্যাপারে অবিভক্ত – দেশের মানুষের উন্নতি। অবশ্যই রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা সকলের আলাদা, কিন্তু বেসিক সুযোগ​-সুবিধায় কেউ আপস করেন না।

সেখানে ভারতবর্ষে বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর মূল লক্ষ্য​, কিভাবে নিজের আখের গোছানো যায়​। সাধারণ মানুষকে সেবা করবেন বলে নিশ্চ​য়ই রাজনৈতিক দাঙ্গা, খুন ইত্যাদি করানো হ​য় না! শুধু নেতা-নেত্রী কেন​, ছোটব​ড় সবাই সুযোগ বুঝলেই নিজের পকেটটা ভারী করে ফেলেন​। রেশনের দোকানে চালে কাঁক​ড়​, ইঞ্জেকশনে ভেজাল​, দুধে জল – যতভাবে মানুষকে ঠকিয়ে নিজেদের লাভ করা যায়​, সেই চেষ্টাতেই সবাই রত​।

আর​, সাধারণ মানুষ​? আমাদের, মানে ভারতীয়দের মানসিকতা সেই বাচ্চাদের মতো, যারা বাড়িতে বাবা-মাকে অতিষ্ঠ করে মারে, আর বাইরের লোকের কাছে ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানেনা। আমার ডাচ সহকর্মীদের থেকে প্রায়ই শুনি যে ভারতীয়রা কিছুতেই “না” বলে না। আমি যতবার শুনি, ততবার অবাক হই। দেশে তো যেকোন কথা শুরুই হ​য় “না” দিয়ে, সে আপনি ট্যাক্সিচালক থেকে ট্যাক্স​-ডিপার্টমেন্ট​, যেখানেই যান না কেন​! বিদেশে ভারতীয় আর দেশে ভারতীয় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সত্ত্বা।

সেই ছোটবেলায় হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার গল্প নিশ্চ​য়ই সবাই শুনেছেন​। ভারতে সেই বাঁশীর সুর হচ্ছে – ধর্ম​। এই ধর্মের সুরে মানুষ এতটাই আচ্ছন্ন​, যে এই সাধারণ জীবনযাপনের মানদন্ডগুলো সবাই উপেক্ষা করছেন বা দেখতেই পাচ্ছেন না। নেদারল্যান্ডসে সেই সুরের আবেশ নেই, তার কারণ কি জানেন​? এখানে ৫০% মানুষ নাস্তিক।

যতদিন দেশে ধর্মের নামে ভেদাভেদ হবে, যে কোন ঘটনায় ধর্ম খোঁজার চেষ্টা করা হবে, ততদিন গাফিলতি ঢাকার একটা মোক্ষম অস্ত্র আমরাই সরকারের হাতে তুলে দেব – আর​, শুধু তাই ন​য়​, এই জিগির তুলে প্রতি পক্ষে সেই সরকারের মসনদে বসার রাস্তাটাও পরিষ্কার করে দেব​। আরো অনেক আসিফা-গীতারা ধর্ষিত হবে, আরো অনেক পরিবহ​-র মাথা ফাটবে, আর আমরা অদৃশ্য ধর্মের কোঁচা সামলে যাব​।

যাক​, ভালো থাকবেন​। এইবারের সংখ্যায় হল্যান্ডের হাল​-হকিকতের থেকে ভারতের হাল​-হকিকত নিয়েই বেশী আলোকপাত করার জন্যে ক্ষমা চাইছি, কিন্তু হ​য়তো আবেগের বশেই একটু দিগভ্রান্ত হ​য়ে পরেছি। পরের সংখ্যায় একটুকরো আমস্টারডাম নিয়ে ফিরে আসব​, প্রমিস​!

2 thoughts on “ধর্মে আছি, জিরাফেও আছি..

  • June 19, 2019 at 3:43 pm
    Permalink

    সংক্ষিপ্ত আকারের মধ্যে অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক আলোচনা। লেখককে ধন্যবাদ। এইরকম তুলনামূলক আলোচনা আরও চাই। এটা মূলত রাজনীতি নিয়ে হল। এরপর অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে হলে ভালো হয়।

    Reply
    • June 20, 2019 at 1:10 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ​, সৌমেনবাবু। আমার লেখা আপনার ভালো লেগেছে জেনে আনন্দ পেলাম​। আসলে এই সিরিজটা শুরু করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল নেদারল্যান্ডসের জীবনযাপন সম্বন্ধে হালকা মেজাজে হল্যান্ড​-প্রবাসী বা প্রবাসেচ্ছুক বাঙালীদের অবগত করা। অবশ্যই রাজনীতি, সমাজ​, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদিকে সেই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করাই যায়​, তবে এই মূহুর্তে একটু হালকা বিষ​য় নিয়েই লেখার ইচ্ছা আছে। অদূর ভবিষ্যতে (মানে, যখন হাল্কা লেখার স্টক ফুরিয়ে যাবে আর কি), তখন নিশ্চ​য়ই লেখায় একটু-একটু করে ওজন চাপাতে শুরু করব​।
      ভালো থাকবেন​, পড়তে থাকবেন​!

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *