নেদারল্যান্ডসে দিয়ে পা, যেথা ইচ্ছা চলে যা..

অগ্নিভ সেনগুপ্ত​

আজকাল আমাকে অনেকেই বলেন​, “যা, পাকিস্থান চলে যা!” দুঃখের ব্যাপার​, শুধু মুখেই বলেন​, ভিসা-টিকিট-ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দেন না কেউ। আমার অনেকদিনের ইচ্ছা, পাকিস্থান যাব​। প্রতিবেশী দেশে গিয়ে হরপ্পার প্রত্নতাত্ত্বিক ভগ্নাবশেষ দেখব​, লাহোরি কাবাব খাব​, গিলগিটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করব – কিন্তু ওই ভিসার হাঙ্গামায় যেতে আমার প্রচুর আলস্য। যাব​-যাব করে বাংলাদেশ অবধিও যেতে পারিনি এই জন্যে।

নেদারল্যান্ডসে এসে সেই আলসেমিতে আরো প্রশ্র​য় দিলো – সেনগেন ভিসা। আপনারা অনেকেই জানেন​, ১৯৮৫ সালে সেনগেন এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী ইয়োরোপের বেশ কিছু দেশ বর্ডার কন্ট্রোল ও পাসপোর্ট কন্ট্রোল অবলুপ্ত​।

আপনার কাছে যদি সেনগেন ভিসা থাকে, তাহলে আপনি ইয়োরোপের ২৬টি সেনগেন দেশে বিনা বাধায় প্রবেশাধিকার পেয়ে যাবেন​। আর​, আপনার কাছে নেদারল্যান্ডসের রেসিডেন্স পারমিট থাকলে তার সাথে যোগ হবে আরো কিছু দেশ​, যেমন​ – ক্রোয়েশিয়া, মন্টেনেগ্রো, বসনিয়া ইত্যাদি​। অবশ্যই সেই প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র ট্যুরিস্ট হিসাবে, সেখানে চাকরী বা ব্যবসা করতে গেলে প্রত্যেক দেশের আলাদা ওয়ার্ক পারমিট লাগে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখানে নো-ম্যানস ল্যান্ড বলে কিছু নেই। যেমন​, নেদারল্যান্ডসে বার্লে-নাসাউ বলে একটি শহর আছে, যার ঠিক গায়েই একটি বেলজিয়ান শহর – বার্লে-হার্তোগ​। সীমানা বলতে রাস্তায় কতগুলো টাইল পাতা, যার একদিকে লেখা “NL” – অর্থাৎ নেদারল্যান্ডস​, আর একদিকে “B” – অর্থাৎ বেলজিয়াম​।

যেমন আপনারা বুঝছেন​, আমি একটু অলস। তাই, এতো সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বহু দেশে এখনো যাওয়া হ​য়ে ওঠেনি। উল্লেখযোগ্য না যাওয়া – স্পেন​, স্ক্যান্ডিনেভিয়া (অর্থাৎ, নরওয়ে, সুইডেন​, ডেনমার্ক-আদি), আইসল্যান্ড। ইউনাইটেড কিংডমও (বা, লন্ডন​) যাইনি, সেখানে আবার ভিসা করানোর ব্যাপার আছে।

যেসব দেশে গেছি, তার মধ্যে প্রিয় কিছু জায়গা এবং অভিজ্ঞতার গল্প বরং আপনাদের শোনাই।

প্রথমেই নাম করতে হ​য় অস্ট্রিয়ার​। ভারতীয়দের কাছে ইয়োরোপে আল্পস মানে সুইজারল্যান্ড​, সৌজন্যে যশ চোপড়া। কিন্তু, আমার কথা যদি শোনেন​, আল্পসের সৌন্দর্য্য দেখতে অস্ট্রিয়া যান​। আমরা প্রথমবার গেছিলাম চেক রিপাবলিক হয়ে – প্রাগ থেকে ভিয়েনা, সেখান থেকে সাল্সবার্গ​, আর তারপর ইনসব্রুক​। আমার একটা স্বপ্ন আছে, রিটায়ারমেন্টের পরে ইনসব্রুকে একটা বাড়ি কিনব​, সেখানেই থাকব​। অপূর্ব সুন্দর শহর​। মনে হবে, আপনি হাত বাড়ালেই পাহাড়টাকে ছুঁতে পারবেন​। আমরা যে হোটেলে ছিলাম​, সেইটা একটা উপত্যকার মধ্যে। সকালবেলা, গরম কফির কাপ হাতে আপনি উপত্যকায় সূর্যোদ​য় দেখছেন – স্বর্গ যদি থাকে কোনখানে, তবে তাহা এইখানে!

সাল্সবার্গও খুব সুন্দর শহর​, আর ওখানকার নুনের খনি বিখ্যাত​। তবে আমার ভালো লেগেছিল হলস্তাত​। দুটো পাহাড়ের মাঝে একটা বিশাল ব​ড়ো লেক​, সেখানে মোটরবোট করে আপনি একপাড় থেকে আর​-এক পাড়ে যেতে পারেন​। সুন্দর পরিবেশ​, শুধু খাওয়া-দাওয়ার জায়গার অভাব​।

এ তো গেল পাহাড়ের কথা। সমুদ্র যদি আপনি দেখতে চান​, আমার দুইখান সাজেশন আছে।

ক্রোয়েশিয়া, এবং পর্তুগাল​।

গেম অফ থ্রোনসের ভক্তদের কাছে ক্রোয়েশিয়ার দুব্রোভনিক এখন প্রায় রিলিজিয়াস ডেস্টিনেশন​। কিংস ল্যান্ডিং দেখার জন্যে হাজার​-হাজার মানুষ ভীড় করছেন অ্যাড্রিয়াটিকের তীরের এই শহরে।

এখান থেকে আপনি চলে যেতে পারেন বেশ ক​য়েকটি ছোট​-ছোট সুন্দর দ্বীপে। উল্লেখযোগ্য​, লোক্রাম আইল্যান্ড​।

দুব্রোভনিক থেকে নৌকায় আধঘন্টা, যানবাহন​-বিহীন একটি ছোট্ট দ্বীপ​। সেখানে সব থেকে সুন্দর হচ্ছে সমুদ্র থেকে আলাদা হ​য়ে যাওয়া একটা ব্যাক​-ওয়াটার পুল​। চারিদিকে পাথরে ঘেরা ঘন সবুজ স্বচ্ছ জল​, আপনি ইচ্ছা হলে সাঁতার কাটুন কি পাথরের উপরে বসে সৌন্দর্য উপভোগ করে কাটিয়ে দিন একটা দিন​।

এখানে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা নেই, সুতরাং শেষ ফিরতি বোটের সম​য়টা জেনে নেবেন কিন্তু!

আর পোর্তুগাল – অতলান্তিক মহাসাগরের তীরবর্তী দেশ​, যেখান থেকে ভাস্কো-দা-গামা প্রথম ভারতবর্ষের কালিকট বন্দরে এসেছিলেন। যে ঘটনাকে ইয়োরোপীয় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গোড়াপত্তন বলা যেতে পারে। ইতিহাসের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য পর্তুগালকে মনোরম করে তুলবে আপনার কাছে।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবন​, কিন্তু ওখানে আমরা বেশীক্ষণ ছিলাম না। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল অতলান্তিক​, আর তাই আমরা মূলতঃ দক্ষিণে আলগার্ভ প্রদেশেই ছিলাম​। আলগার্ভের প্রধান শহরগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ফারো (এই অঞ্চলের একমাত্র এয়ারপোর্ট​), আলবুফেইরা এবং লাগোস​। আপনি ফারো থেকে লাগোসের দিকে যত যাবেন​, গ্রোটো ফর্মেশন বা সমুদ্রের মাঝে গুহার সমাবেশ বেশী দেখতে পাবেন​। বিভিন্ন জায়গা থেকে স্পিড​-বোটে চ​ড়ে অতলান্তিক-ভ্রমণ করতে পারেন​, আর সেই ভ্রমণেই আপনি দেখতে পাবেন অপূর্ব​-সুন্দর কিছু গ্রোটো। সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে বেনাগিল কেভ​, যেখানে গুহার মধ্যে আছে একটি ছোট্ট বীচ​। তা ছাড়াও আমার খুব সুন্দর লেগেছিল ‘লাভ গ্রোটো’। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এই গুহাটা হার্ট​-শেপেড​।

আমার যদিও সমুদ্রের থেকে পাহাড় বেশী ভালো লাগে, তবে সমুদ্র-তীরবর্তী দেশে যাওয়ার আমার একটি প্রধান আকর্ষণ – মাছ​! বিভিন্ন ধরণের মাছ ও অন্যান্য সী-ফুড যদি আপনার দুর্বলতা হ​য়​, তাহলে অবশ্যই পোর্তুগাল বা ক্রোয়েশিয়া ঘুরে আসুন​।

আজকের মতো আমার কথাটি ফুরালো, তবে আপনাদের ভালো লাগলে নটে গাছটি মুড়াবে না। পরের সংখ্যায় ইয়োরোপের কিছু অন্যান্য লোকেশন নিয়ে লেখার ইচ্ছা রইলো। অবশ্যই, আপনারা সাহস যোগালে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *