ছবির গল্প, গল্পের ছবি – ৩

জাপানের দক্ষিণের একটা দ্বীপ কায়সু। এই দ্বীপের মধ্যে সমুদ্রের ধারে মিনামাতা বলে একটা জনপদ আছে। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীদের জীবিকা হল চাষবাস আর মাছধরা। এক আমেরিকান টুরিস্ট দম্পতি এলেন সেই গ্রামে। সেখানে তাঁরা একটা ঘর ভাড়া নিয়ে বাস করতে লাগলেন। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে তাঁরা মেশেন। তাদের খাবারদাবারও তাঁরা খান। আর সারাদিন এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করেন। ছবি তোলেন। সকলেই ভাবে এঁরা টুরিস্ট। আমেরিকান টুরিস্টদের অনেকে অনেকসময় খেয়ালি হয়। তাদের নানারকমের শখ থাকে। এঁরাও হয়ত তেমনি কোন দম্পতি। অনেকদিন মিনামাতায় তাঁরা রইলেন।

প্রায় তিন বছর। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত।
১৯৫০ সাল থেকে এখানকার স্থানীয় মানুষজন অদ্ভূত এক অজানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছিল। তাদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো, বিশেষকরে ঠোঁট দুটি সবসময় ঝিনঝিন করত। পরে অসাড় হয়ে পড়ত। শরীরের মাংসপেশী সঞ্চালনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকত না। কথা যেত জড়িয়ে। অনেকে একেবারে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ল আবার অনেকে মারাও গেল। এই অদ্ভূত রোগটার নাম হয়ে গেল মিনামাতা রোগ। রোগটা কী ছোঁয়াছে? এত লোক একসঙ্গে কী করে এমনভাবে সংক্রামিত হচ্ছে? সরকারের টনক নড়ল। তারপর জানা গেল আসল ঘটনা।
মিনামাতা জনপদে সমুদ্রের ধারে একসময় তৈরি হয়েছিল এক বিশাল রাসায়নিক কারখানা। নাম চিসো কর্পোরেশন। তাদের কারখানার বর্জ্য পদার্থগুলো ফেলে দিত সমুদ্রের জলে। তাতে থাকত মিথাইল মার্কারি। সমুদ্রের জলে তা মিশে যেত। ফলে জলের মাছও বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। সেই বিষাক্ত মাছ খেয়েই এখানকার মানুষজনের শরীরে মিথাইল মার্কারি বিষ ঢুকে গিয়েছিল। এর ফলেই এই বিপত্তি।

এইরোগে আক্রান্ত হয়েছিল মিনামাতার প্রায় দশহাজার মানুষ। একশ তিনজন মানুষ মারা গিয়েছিল। আর প্রায় সাতশো জনের অবস্থা হয়ে উঠেছিল সঙ্গিন। চিসো কর্পোরেশন এর সামগ্রিক দায় স্বীকার করতে চাইল না। এর ফলে ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা হল।

কেউ জানতেই পারেনি এই আমেরিকান টুরিস্ট দম্পতির আসল পরিচয়। আসলে এঁরা হলেন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ইউজিনি স্মিথ ও তাঁর স্ত্রী আইলিন। এখানে এসেছিলেন এইসব আক্রান্তদের ছবি তুলে এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করতে। টুরিস্টের ছদ্মবেশে মিনামাতায় ঘুরে ঘুরে তাঁরা আক্রান্তদের ছবি তুলতে লাগলেন। চিসো কর্পোরেশন যেখানে বর্জ্য পদার্থগুলো ফেলত সেখানকারও অনেক ছবি তুললেন।

টোমোকো ইউমুরা বলে একটি কিশোরী ওই মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একেবারে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ছিল। তার সেবাশুশ্রূষা সমস্তই করত তার মা। স্মিথ টোমাকোর বাবা- মার সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁদের তিনি বললেন টোমাকোর এমন একটি ছবি তুলতে চান যেটা এই রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সারা বিশ্বের মানুষ জানতে পারবে। টোমোকোর মা রাজি হলেন। মেয়েটিকে বাথটবে স্নান করানোর সময় তার একটা ছবি তুলে ফেললেন।

এদিকে চিসো কর্পোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে খবরটা পৌঁছে গেল। তাঁরা জেনে গেলেন এই ছদ্মবেশী টুরিস্টরা হলেন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ইউজিনি স্মিথ ও তাঁর স্ত্রী আইলিন। তাঁরা প্রমাদ গোনলেন। স্মিথকে এক বিশাল অঙ্কের টাকা তাঁরা ঘুষ দিতে চাইলেন যাতে এইসব ছবি তিনি প্রকাশ না করেন। জনসমক্ষে এইসব যাতে না নিয়ে আসেন। স্মিথ যথারীতি তাঁদের এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলেন।
১৯৭২ সালে মিনামাতা নিয়ে একটি চিত্রকাহিনির সঙ্গে ছবিটি প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বে সাড়া পড়ে গেল। দূষণের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জনমত সংঘঠিত হল। এ ছাড়া এইসব ছবির প্রদর্শনী হয়েছিল বিশ্বের নানা জায়গায়।
চিসো কর্পোরেশন রাগে ফুঁসছিল। স্মিথকে তারা ছাড়ল না। ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে একদিন কারখানার গেটের সামনে স্মিথকে বেদম মারা হল। গুন্ডারা তাঁকে আছড়ে মেরেছিল কারখানার দেওয়ালে। প্রচন্ড আহত হয়ে স্মিথ হাসপাতালে অনেকদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। তারপর তাঁর স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ল। আমেরিকার আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে কিছুদিন পড়ালেন। তারপর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন।
মিনামাতা রোগে আক্রান্তদের জন্য চিসো কর্পোরেশন অনেকটাকা ক্ষতিপূরণ দিতে অবশেষে বাধ্য হল। ইউজিনি স্মিথের তোলা ছবিগুলো তারা কোনমতে আর অস্বীকার করতে পারেনি।
ক্যামরা শুধুমাত্র সৌখিন ছবিতোলার জন্যই ব্যবহৃত হয় না। কখনও কখনও তা প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়েও ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *