ছবির গল্প, গল্পের ছবি – ২

মিহিররঞ্জন মন্ডল

২ রা এপ্রিল, ১৯৫৪ সাল। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার হরমোসা সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রসৈকতের কাছেই রয়েছে সারি সারি বিচহাউস। সেদিন এমনই এক বিচহাউসের চাতালে চেয়ারে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন লস এঞ্জেলিস টাইমস্ – এর ফটোগ্রাফার জ্যাক গন্ট। পাশের চেয়ারে পড়ে রয়েছে তাঁর রোলিফ্লেক্স ক্যামেরাটা। জ্যাকের দুচোখে তখন সবে একটু ঝিমুনি লেগেছে। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ সাইরেনের আওয়াজে তাঁর তন্দ্রা টুটে গেল। বিপদজ্ঞাপক সাইরেন। কোথাও নিশ্চয়ই কোন বিপদ ঘটেছে। ধড়মড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে জ্যাক তক্ষুনি ছুটে গেলেন সমুদ্রের ধারে।
সমুদ্রের ধারে গিয়ে জ্যাক দেখলেন এক অদ্ভূত দৃশ্য। এক তরুণ দম্পতি পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। উত্তাল ঢেউগুলো এসে ভেঙে পড়ছে তাঁদের পায়ের কাছে। যেন কোন ছায়াছবির একটা রোমান্টিক দৃশ্য!

কিছু না বুঝেই জ্যাক নিমেষের মধ্যে ওই দৃশ্যের পরপর চারটি ছবি তুলে ফেললেন। তাঁর ক্যামেরাটা আগে থেকেই জোন ফোকাসিং- এ রাখা ছিল। অ্যাপারচার আর শাটার স্পিডও ছিল ঠিকঠাক। দরকার মতো ছবিতোলার জন্য ক্যামেরাটা সবসময় রেডি রাখতেন তিনি।
পরে জ্যাক জানতে পারলেন যে ছবি তিনি তুলেছেন তা রীল লাইফের কোন রোমান্টিক শ্যুুটিং- এর দৃশ্য নয়। তা রিয়েল লাইফের হৃদয় বিদারক এক মর্মস্পর্শী ঘটনার ছবি।
ওইদিন ওই দম্পতির দেড় বছরের এক শিশুপুত্র সবার অলক্ষ্যে তাদের কটেজ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সমুদ্রর ঢেউ দেখে সে উল্লসিত হয়ে টালমাটাল পায়ে এগিয়ে যেতেই সমুদ্রে ভেসে গিয়েছিল।

উদভ্রান্ত পিতা শিশুপুত্রের খোঁজে তখন পাগলের মতো উত্তাল সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন আর শোকাতুরা জননী তাঁকে প্রাণপণে বাধা দিতে চাইছেন।
পরের দিন টাইমস্ – এর প্রথম পাতায় ছবিটি বের হল। এই ছবির জন্য জ্যাক পেলেন প্রভূত খ্যাতি ও সম্মান। ছবিটি পরে পুলিৎজার ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসেরর পুরস্কার পেয়েছিল। পুলিৎজার কমিটি ছবিটির টাইটেল দিয়েছিলেন- ” ট্রাজেডি বাই দি সী। “
না জেনে ছবিটি তুলে ফেলার জন্য একসময় জ্যাকের খুব অনুশোচনা হয়েছিল। কারণ তখন বাড়িতে ছিল তাঁর নিজেরই এক তিনবছরের এক শিশুপুত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *