ছবির গল্প, গল্পের ছবি – ১

মিহিররঞ্জন মন্ডল

১৯৩৩ সাল। বিখ্যাত ” লাইফ ” ফটোগ্রাফার আলফ্রেড আইজেনেস্তাদ এসেছেন জেনিভায়, লিগ অফ নেশনস্- এর পঞ্চদশ অধিবেশন কভার করতে। শুনলেন হিটলারের প্রধান প্রচার সচিব ড. গোয়েবেলস্ তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে উঠেছেন জেনিভার কার্লটন হোটেলে।

তক্ষুনি তিনি কার্লটন হোটেলে ছুটলেন ছবি তুলতে। ওখানে গিয়ে দেখলেন গোয়েবেলস্ হোটেলের বাগানে একটা চেয়ারে বসে আছেন। কয়েকজনের সঙ্গে হেসে কথা বলছেন। পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি আর হিটলারের দোভাষী ড. পল স্কিমিট। দূর থেকে তাঁর কয়েকটি ছবি তুললেন আইজেনেস্তাদ। এরপর একেবারে কাছে এগিয়ে এলেন তিনি গোয়েবেলস্-এর কিছু ছবি তুলতে।

আলফ্রেড আইজেনেস্তাদ

গোয়েবেলস্ তখন পাশে কারও দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন। হঠাৎ আইজেনেস্তাদের দিকে তাঁর চোখ পড়ল। মুহূর্তে তাঁর মুখেরভাব পাল্টে গেল। দুচোখে ফুটে উঠল তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ। চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। এই ইহুদিটা কিনা তাঁর ছবি তুলছে!

গোয়েবেলস্ তখন পাশে কারও দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন।

আইজেনেস্তাদ এই মুহূর্তটির জন্যই যেন এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। এই সেই ছবিতোলার প্রকৃষ্ট সময়, ডিসাইসিভ মোমেন্ট। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ক্যামেরার শাটারে হাত পড়ল। টুক করে ছবিটি তিনি তুলে ফেললেন। গোয়েবেলস্- এর কিছুই করার নেই। কারণ লাইফ পত্রিকার অ্যাক্রেডিটেড ফটোগ্রাফার আইজেনেস্তাদ। তাই ছবি তিনি তুলতেই পারেন।
ছবিটি সম্পর্কে অনেকপরে আইজেনেস্তাদ বলেছিলেন- ” ছবিটার ক্যাপশন হওয়া উচিত ছিল- ফ্রম গোয়েবেলস্ উইথ লাভ। “
আইজেনেস্তাদ ছিলেন জার্মান- ইহুদি। নাৎসিদের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন ইউরোপে। তখন দলেদলে জার্মান আর অস্ট্রিয়ান ইহুদিরা দেশ ছেড়ে চলে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুইৎজারল্যান্ড, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও আমেরিকায়।
চিত্র সাংবাদিক হিসাবে আইজেনেস্তাদ অনেক আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। নাৎসি নেতাদের উপর ছিল তাঁর প্রচন্ড ঘৃণা।
জোসেফ গোয়েবেলস্ নিজে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্মান ফিলসফিতে ডক্টরেট করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন রুগ্ন। একটা পা ছিল খোঁড়া। শৈশবে পোলিও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে এমন হয়েছিল। গোয়েবেলস্ ছিলেন প্রচন্ড উচ্চাভিলাষী। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তাঁর প্রচন্ড ইহুূদি বিদ্বেষের জন্য তিনি হিটলারের নজরে পড়েছিলেন। হিটলার তাঁকে করেছিলেন তাঁর প্রধান প্রচারসচিব।
নাৎসিদের প্রচার সচিব হিসাবে গোয়েবেলস্- এর বৈশিষ্ট হল জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তাঁর মতবাদ, ইহুদিদের ধ্বংস ও কমিউনিজম বিরোধিতা। তাঁর মতে জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে হলে দরকার হলে মিথ্যা বলতে হবে এবং তা বারবার। তাহলে একসময় মিথ্যাটাই তাদের কাছে সত্য বলে মনে হবে। জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে পারতেন গোয়েবেলস্। জার্মান যুবসম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করতেন এভাবেই। 
গোয়েবেলস্ জার্মান গণমাধ্যমগুলি দখল করে নিয়েছিলেন। দেশের সমস্ত পত্রপত্রিকাকে বাধ্য করা হয়েছিল নাৎসি মতবাদ প্রচার করতে। সে সময় সবে রেডিও এসেছে। গোয়েবেলস্ রেডিও সম্প্রচারের উপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করেছিলেন। যুদ্ধের সময় শোনা যেত হিটলার আর গোয়েবেলস্- এর রণহুঙ্কার। মিথ্যা প্রচার করে দেশের প্রকৃত অবস্থা জার্মান জনসাধারণকে জানতে দেওয়া হত না। এমনকি জার্মানি যখন যুদ্ধে পিছু হটছে তখনও নাৎসিদের সপক্ষে ক্রমাগত প্রচার করে গেছেন গোয়েবেলস্।
১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে মিত্রশক্তি তখন ক্রমাগত বার্লিন শহরের বুকে বোমাবর্ষণ করে ছারখার করে দিচ্ছে। জার্মানির পরাজয় আসন্ন। রেড আর্মি এগিয়ে আসছে। গোয়েবেলস্ ঠিক করলেন সপরিবারে তিনি আত্মহত্যা করবেন। কিছুতেই শত্রুর হাতে ধরা দেবেন না। ১লা মে স্ত্রী মাগডা আর ছয়টি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রবেশ করলেন মাটির নীচে হিটলারের বাঙ্কারে।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কিছুই জানে না। কী হতে চলেছে তাদের কোন ধারনাই নেই। হেলগা- ১২, হেলডেগার্ড- ১১, হেলমুট- ৯, হোলডি- ৮, হেডুউইগ- ৬ এবং হেইডা – ৪……. নিজেদের ফুলের মতো এই শিশুদের মেরে ফেলার নির্দেশ দিলেন তাদের নিজের বাবা- মা। মরফিন আর সাইনাইড দিয়ে শিশুদের মেরে ফেলা হল। পরে আত্মহত্যা করলেন গোয়েবেলস্ আর মাগদা।
এভাবেই শেষ হল হিটলারের প্রধান প্রচারসচিব গোয়েবেলস্- এর গোটা পরিবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *