খিল্লী

শেলী নন্দী

—ও মা খিদে পেয়েছে খুব। 
—হুমম। 
—পোহা প্লিজ। 
—হুমম-
—কি হুমমম। জলদি বানাও। 
—হা হা হা। দিচ্ছি দাঁড়া।

মোবাইল এ কিছু একটা দেখে হাসছে মহুয়া একা একাই। ড্রইং ক্লাস থেকে এসে ভিডিও গেম হাতে কাচুমাচু মুখ নিয়ে শোফায় বসে আছে মার্কো।

রান্নাঘরে চিঁড়ে ধুয়ে কড়াই বসিয়েছে মহুয়া। একটু বেশী করে বানাতে হবে আজ। কল্যাণ এখুনি এসে পড়বে অফিস থেকে। আজ সবাই তাড়াতাড়ি যে যার ঘরে ঢুকে নিশ্চিন্তে থাকবে। দুদিন ধরে ফণী আতঙ্ক জনজীবনে তরঙ্গ খেলছে।

—ও মা আজ যে বললে বিশাল ঝড় উঠবে? ড্রয়িং ম্যাম ও তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দিল। কুহেলী আর আর্য তো ক্লাসেই আসেনি। জানো স্কুল অ্যাটেন্ডেন্সও ছিল ভীষণ পুওর। মোটে ফোরটিন।

—-হুমম নিউজ এ তো এমনটাই বলছে। 
পোহা রেএএডি। 
বাদাম গুলো বেছে বেছে আগে খেয়ে নেয় মার্কো। জানলা দিয়ে আকাশের মুডটা দেখে নেয়।

—মা খেলতে যাবো?
—একদম না। আজ কেউ খেলতে যায়?
মাঠে কেউ আসবে না আজ।

হতোদ্যম মুখ নিয়ে পোহা শেষ করতে থাকে মার্কো। 
—দাঁড়া তোর দিদুনকে ফোন করি ওখানে আবার কি অবস্থা কে জানে?

ঘরের মধ্যেই একটা ফুটবল নিয়ে খেলতে থাকে মার্কো। ফোনে মহুয়া একে একে খোঁজ নিতে থাকে ঠাম্মা কাকাই আর বুনী পিসির। 
টিভিটা অন করে মহুয়া। ফণীর আধিপত্যে নিউজ চ্যানেলগুলো আজ সরগরম।

—মা ফণি না ফানি?
ফণী মানে সাপ না?

—হুমম। 
আবার মোবাইলে চোখ ডুবিয়েছে মহুয়া। মুখে হাসি।

—ওমা হাসছো কেন?
—এই শোন। 
হোয়াট্সাপে আসা একটা অডিও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। মহুয়া প্রায় দশবার পেয়েছে অডিওটা। সঙ্গে সঙ্গে ফরোয়ার্ডও। 
—হা হা হা 
মার্কোও হাসছে। 
মা ছলেটাই কি মমতা ব্যানার্জীর গলা করছে?
হি হি হি।

—কে জানে?
—মা সিঙুরের জমি মানে কি? মমতা ব্যানার্জীর ছবি দেওয়া এটা কী?

হোয়াট্সাপের কোল জুড়ে ফণী রিলেটেড গুচ্ছের পোষ্ট। 
কলিং বেল বেজে ওঠে। মহুয়া দরজা খুলতে যায়। মোবাইল মার্কোর হাতে। স্ক্রীন জুড়ে কার্টুন টাইপ্স ছবিগুলো দেখতে থাকে মার্কো। 
মজার মজার পোষ্ট সব ঐ ফণী নিয়ে।

কল্যাণ এসে গেছে। নিউজ চ্যানেলের ভলিউমটা বাড়িয়ে জুতো খুলতে থাকে। 
—বাবা আজ তোমাদেরও আগে ছুটি?
—ছুটি ই বলতে পারিস। চা করো একটু কড়া করে। শম্ভুর দোকানের সিঙারা এনেছি। একদম গরম।

আয় ফণী ঝেপে-
চপ দেবো খেতে-
যা ফণী চলে যা-
সাথে চটিপিসিকে নিয়ে যা।

সুর করে পড়ছিল মার্কো মোবাইল দেখে দেখে। 
বাবা চপ কেনো দেব সিঙারা দেবো। 
চটিপিসি কে বাবা?

—মার্কো মা এর মোবাইল তোমার হাতে কেন?
—হেব্বি মজার মজার জিনিস মায়ের মোবাইলে।

রান্নাঘর থেকে মহুয়া হাঁক দেয় মার্কো কে। 
—বই নিয়ে বস। কাল স্যাটারডে। সাইন্সের স্যার এক্সাম নেবে কিন্তু।

—একটু পর মা প্লিজ।

মোবাইল নিয়ে নেয় মহুয়া। চায়ের কাপ আর সিঙারা সাজানো টেবিলের উপর। একটু কামড় দিয়ে মজার পোষ্টগুলো ফরোয়ার্ড করতে ব্যস্ত হয় অভ্যস্ত আঙুল। প্রেরকদের হাসির আইকন পাঠিয়ে জানান দেয় ‘দারুন’।

কল্যাণ অফিসের ফোন অ্যাটেন করে চা শেষ করে। 
—ও মা চটিপিসি কে বলো না?
—মমতা ব্যানার্জীকে খিল্লী করে চটিপিসি বলা হয়। 
—খিল্লীঈঈঈ? মানে?
—ওফ মার্কো। অনেক হয়েছে যাও স্টাডি রুমে।

কল্যাণের ফোনটায় মেসেজ ঢুকছে হুড়মুড়িয়ে। রাস্তায় নেট ইউজ করে না। বাড়ীতে ওয়াইফাই বন্যা নামায় তাই। ফোনটা হাতে নিতেই
—ডিসগাস্টিং। 
যত্তোসব সিলি সিলি জোক্সে কি যে মজা?
আচ্ছা মহুয়া তুমিও?
—কী করলাম?
—খিল্লীবাজির জিনিস এনজয় করো তুমিও?
কী শিখছে মার্কো এতে?
—সিরিয়াস হ’চ্ছ কেন তুমিই বা। 
জোক্স দেখো আর জাস্ট টেক ইট ইজি।

—তুমি জানো কতটা ক্ষতি হয়েছে ওড়িশায়? কতজন মারা গেছে ওখানে?
রাস্তার লোকগুলো কিভাবে ত্রিপল মাথায় চেপে বৃষ্টি আটকায় মাথা বাঁচাতে?
একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যা থেকে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সেগুলো নিয়েও মানুষ ?

—থামো তো। এতো রিয়্যাক্ট করার কিচ্ছু নেই। 
—মহুয়া রাস্তায় আজ একটা বাচ্চাকে দেখলাম খুব কাঁদছে। আমার গাড়ী তখন সিগনালে। ফুটপাথটায় জল কাদা আর বাচ্চাটা বাঁধা একটা ল্যাম্প পোষ্টে। তুমি আমি যখন ছাদের তলায় নিশ্চিন্তে ঘুমাই তখন ওদের মাথার আকাশ বৃষ্টি নামায়। ফণীর আঁচড়ে তোমার আমার কিছু না হলেও ঐ মানুষগুলোর অনেক কিছু হয়।

ফণী এলো না এলো না 
কেন এলো না জানি না–

এগুলো পড়ে হাসি পাচ্ছে কিন্তু যদি সত্যিই ভয়াবহ ভাবে আছড়ে পড়তো আমাদের উপর? ধরো চোখের সামনে তুমি দেখলে তোমার দোতলা বাড়ীটা ভেঙে গেলো তখন হাসি পাবে তো?
—হুমম ঠিকই বলেছো।

মার্কো গিলছে কথা গুলো। চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্নের ভিড়। 
মহুয়াও খানিক হতভম্ব।

—বাবা মমতা ব্যানার্জী তো চিফ মিনিস্টার অফ ওয়েষ্ট বেঙ্গল তাহলে চটিপিসি কেন?

—উনি পায়ে চটি পরেন তাই। মার্কো উই শুড রেসপেক্ট এলডার্স তাই ওসব দেখে হাসবে না।

মায়ের দিকে তাকায় মার্কো। 
স্টাডিরুমের দিকে এগোয় সে। কল্যাণ বাথরুমে ঢোকে। মহুয়া রাতের চালটা ভিজিয়ে রাখে। এবার বসবে মার্কোর হোমটাস্ক নিয়ে।

—মহুয়া টিশার্টটা দিয়ে যাও না। 
আমরা শিক্ষিত মহুয়া। তাই বলবো সস্তার খিল্লীকে প্রশ্রয় দিওনা।

মহুয়ার নির্বাক দৃষ্টিতে কল্যাণ শ্বাস নেয়। 
মার্কো পড়ছে। মহুয়া মোবাইল গ্যালারি থেকে সাফ করছে সস্তার খিল্লীপোষ্ট গুলো দামী সময়টাতে। 
বাইরের হালকা বৃষ্টিতে রাস্তার ধুলো মরছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *