Home » জ্ঞান জগত » রাজনৈতিক শিক্ষা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা পর্ব – ১

রাজনৈতিক শিক্ষা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা পর্ব – ১

সৌমেন পাত্র

আমাদের দেশে রাজনৈতিক চিন্তাধারার দিক থেকে তিন ধরণের মানুষ দেখা যায়। একদল আছেন যারা রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত, যদিও এঁদের সংখ্যা নগণ্য। আরেকদল আছেন যারা রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত। আরেকদল হলেন রাজনৈতিক ভাবে কুশিক্ষিত।

রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত কাদের বলব? যারা দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য একটি সরকারের প্রধান করণীয় কী, সেই বিষয়ে মোটামুটি ওয়াকিবহাল, তাঁদের আমরা রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত বলতে পারি। এঁরা জানেন, একটি সরকারের প্রধান কাজ হল শিল্পোন্নয়ন ঘটানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, সকলের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা ইত্যাদি। এঁরা এই কাজগুলির ভিত্তিতেই কোন সরকারের মূল্যায়ন করেন এবং কোন দলকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রেও এই বিষয়গুলিকেই মাথায় রাখেন।

এরপর আসেন রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিতরা। এঁরা রাজনীতি নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে রাজি নন। এঁদের কাছে রাজনীতি একটি নোংরা শব্দ। একমাত্র ধান্দাবাজ লোকেরাই রাজনীতি করেন, “ভদ্রলোকে” কখনও রাজনীতি নিয়ে কথা বলে না – এই হল এঁদের মত।

তৃতীয় দলে আছেন রাজনৈতিক ভাবে কুশিক্ষিতরা। এঁরা দ্বিতীয় দলের মতো রাজনীতির ব্যাপারে উদাসীন নন। এঁদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মত আছে, এঁরা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থনও করেন। তাহলে এঁদের সঙ্গে প্রথম দলের পার্থক্য কী? আমরা এঁদের রাজনৈতিক ভাবে “শিক্ষিত” না বলে “কুশিক্ষিত” বলছি কেন? এর কারণ হল, এই তৃতীয় দলের ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মত ও সিদ্ধান্তগুলি প্রথম দলের মতো সঠিক রাজনৈতিক কারণের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এঁরা শিল্পোন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আবেগ, ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থ কিংবা ধর্মীয় গোঁড়ামির দ্বারা চালিত হন। এই কারণেই এঁরা অশিক্ষিত না হলেও শিক্ষিতও নন। এঁরা হলেন কুশিক্ষিত। রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত মানুষেরা যেখানে অরাজনৈতিক, সেখানে এই কুশিক্ষিত মানুষেরা হলেন অরাজনৈতিক কারণে রাজনৈতিক।

এখন প্রশ্ন হল, গণতান্ত্রিক দেশের একজন নাগরিকের নিজেকে কোন শ্রেণীতে রাখা উচিত। আমি শ্রেণীগুলির নামকরণ যেভাবে করেছি, তার থেকে পাঠক হয়তো অনুমান করতে পেরেছেন যে, আমি রাজনৈতিক শিক্ষার পক্ষে, অশিক্ষা বা কুশিক্ষার পক্ষে নই।

একটি দেশের উপরে সেই দেশের সরকারের প্রভাব যে ঠিক কত বিপুল, তা আমরা প্রায়ই উপলব্ধি করতে পারি না। দেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার সার্বিক মান প্রত্যক্ষভাবে এবং বিপুলভাবে নির্ভর করে সরকারের কার্যকারিতার উপর। দক্ষ ও দায়িত্বশীল সরকার যেমন নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানকে আকাশচুম্বী উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তেমনি অদক্ষ ও দায়িত্বহীন সরকার নাগরিকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। এখন আমরা নিজেদের দেশের দিকে তাকালে কী দেখি? স্বাধীনতার পরে যে এতগুলো বছর কেটে গেছে, তাতে কি আমাদের দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানের কাঙ্খিত উন্নতি হয়েছে? আশা করি, এই প্রশ্নে সকলেই নঞর্থক উত্তরই দেবেন। এই একবিংশ শতকেও আমাদের দেশে বিপুল দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বেকারত্ব বিরাজমান। বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, জীবনযাত্রার ন্যূনতম সুবিধাগুলি থেকেও তাঁরা বঞ্চিত, অপুষ্টিতে ও অশিক্ষার অন্ধকারে তাঁদের দিন কাটে। আমি আর খুঁজে খুঁজে পরিসংখ্যান দিচ্ছি না, বাস্তব অবস্থাটা আমরা সবাই জানি।

এই অবস্থায় আমরা সাধারণ মানুষেরা কী করতে পারি? আমরা নিশ্চয় কারখানা খুলে নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি না, স্কুল খুলে নিজেদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি না, হাসপাতাল খুলে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে পারি না। কারণ আমাদের কারও সেই অর্থ ও ক্ষমতা নেই। কেউ বলতে পারেন, আমরা কেউ এককভাবে এসব কাজ করতে না পারলেও সবাই মিলে হয়তো করতে পারি – চাঁদা দিয়ে বারোয়ারি পুজো করার মতো। কিন্তু ভেবে দেখুন, এরকম “চাঁদা” কিন্তু আমরা প্রত্যেকে প্রতিদিন দিয়ে চলেছি ঠিক এই কাজগুলিই করবার জন্য। সেই চাঁদা হল সরকারকে দেওয়া আমাদের ট্যাক্স। আমরা প্রত্যেকে সরকারের হাতে অর্থ ও কর্তৃত্ব তুলে দিচ্ছি আমাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার জন্য। অথচ আমাদের সরকার কি সেই কাজ সঠিকভাবে করছে? যদি করত, তাহলে নিশ্চয় আমাদের দেশে এত বেকারত্ব থাকত না, আমাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য প্রাইভেট টুইশন দিতে হত না, চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যেতে হত না। আমরা একদিকে সরকারকে ট্যাক্স দিচ্ছি স্কুল ও হাসপাতাল চালানোর জন্য, আবার অন্যদিকে প্রাইভেট টুইশন ও প্রাইভেট ডাক্তারের জন্যও আমরা টাকা দিচ্ছি। আর যাদের তা দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা বংশানুক্রমে অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে আর বড়ো কোন রোগ হলে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।

এটা আমরা ভাবছি না যে, ওই ট্যাক্সের টাকা আর ওই বিপুল কর্তৃত্ব শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ও সীমান্তে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য আমরা সরকারকে দিইনি। আমাদের সন্তানদের কাজের উপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করা, শিক্ষার শেষে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং তারা যাতে সুস্থ শরীরে সারাজীবন কাজ করতে পারে, তার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা – এই তিনটে হল সরকারের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব। নিরাপত্তা তো একটা বেসিক ব্যাপার, সেটা তো অবশ্যই চাই। কিন্তু যে মানুষ কাজের অভাবে খেতে পায় না, শুধু নিরাপত্তা দিয়ে সে কি ধুয়ে জল খাবে? (চলবে)

আপনার মতামত:-