রাজনৈতিক শিক্ষা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা পর্ব – ৩

সৌমেন পাত্র

যে দেশের সিংহভাগ নাগরিক রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত বা কুশিক্ষিত, সেই দেশে আপনি রাজনৈতিক শিক্ষিত হয়ে ভোটের ফলকে প্রভাবিত করতে পারবেন না, এই নৈরাশ্যজনক সত্যটা আপনাকে মেনে নিতেই হবে। কিন্তু ওখানেই থেমে গেলে আপনার চলবে না। আসুন, ব্যাপারটা আরেকটু তলিয়ে ভাবা যাক। যদিও আপনি এতদিন উল্টোটাই ভাবতেন, কিন্তু গণতন্ত্রে আসল ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে, নেতাদের হাতে নয়। জনগণ নেতাদের হাতের পুতুল নয়, নেতারাই জনগণের হাতের পুতুল। জনগণ যে সেই পুতুলদের শুধু চালনা করে তাই নয়, তারা তাদের সৃষ্টি করে। তাই যেকোন গণতন্ত্রে জনগণের যেমন চাহিদা, ঠিক তেমন নেতাই তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক দেশে যদি আপনাকে কোন পরিবর্তন আনতেই হয়, তাহলে নেতাদের দিয়ে শুরু করলে হবে না, শুরু করতে হবে জনগণকে দিয়ে। ইংরেজিতে দুটো কথা আছেঃ টপ-ডাউন আর বটম-আপ। উপর থেকে শুরু করে নিচের দিকে যাওয়া আর নিচ থেকে শুরু করে উপরের দিকে যাওয়া। গণতন্ত্রে টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ কাজ করবে না, আপনাকে বটম-আপ পদ্ধতিতে এগোতে হবে। আগে জনগণের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে, তখন জনগণই যোগ্য নেতাদের তুলে আনবে।

এখন এত বড়ো দেশের জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো একদিনের কাজ নয়, একজনেরও কাজ নয়। এই কাজ অনেকের দ্বারা বহু বছর ধরে একটু একটু করে হবে। এই সত্যটিও আপনাকে মানতে হবে। নচেৎ আপনি কাজ শুরু করার উৎসাহই পাবেন না। আমাদের স্বভাবসিদ্ধ ধর্মই হল, আমরা তাৎক্ষণিক ফলে বিশ্বাসী। যে কাজে তৎক্ষণাৎ সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেই কাজে আমরা সহজে উৎসাহিত হই। কিন্তু আপনাকে মেনে নিতেই হবে, সব কাজ ওইভাবে হয় না। এটা তো আর এরকম নয় যে, আপনার বাড়িতে একটি ইলেকট্রিক ফ্যান খারাপ হয়ে গেছে, আপনি মিস্ত্রীকে ফোন করলেন আর সে এসে ফ্যান সারিয়ে দিয়ে গেল। আপনি একটি বিশাল দেশের জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটাতে চান। সে কাজে যে বহু সময় লাগবে, সেটাই স্বাভাবিক।

পৃথিবীর কোন দেশের মানুষই গণতন্ত্রের জন্য হঠাত করে প্রস্তুত হয়ে যায় নি। মনে করুন, আজকে ইউরোপের দেশগুলো রাজনৈতিক ভাবে খুব সচেতন। কিন্তু তারা কি চিরদিনই এরকম সচেতন ছিল? মধ্যযুগে ইউরোপে সামন্তপ্রথা প্রচলিত ছিল। তখন ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ ছিল সার্ফ বা ভূমিদাস। প্রভুর হুকুম তামিল করাই ছিল তাদের একমাত্র কাজ। সেই অবস্থা থেকে আজকের রাজনীতি-সচেতন ইউরোপ নিশ্চয় হঠাত করে তৈরি হয়নি। “Every nation gets the government it deserves.” – এই বিখ্যাত উক্তিটি যে ফরাসী লেখক করেছিলেন, উইকিপিডিয়াতে দেখলাম, তাঁর জীবনকাল ১৭৫৩-১৮২১। অর্থাৎ ওই সময়েও ইউরোপের মানুষ রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত ছিল। সেইজন্যেই ওনার ওই কথাটি মনে হয়েছিল। আজ নিশ্চয় ইউরোপের কোন লেখক এরকম কথা লিখবেন না।

আজকে বরং ভারতের মতো দেশের রাজনৈতিক ভাবে সচেতন নাগরিকেরা ওই উক্তিটি বারবার উদ্ধৃত করেন। এর কারণ, রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকে ইউরোপ অষ্টাদশ শতকে যে অবস্থায় ছিল, আমাদের দেশ এখন হয়তো সেই অবস্থায় আছে। যেদিন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে, সেদিনই আমরা ইউরোপের দেশগুলোর মতো সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল সরকার পাব।

এখানে যদি কারও মনে হয় যে, আমি এক ধরণের নিষ্ক্রিয়বাদ বা নিয়তিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে আমার প্রকাশভঙ্গির ত্রুটি। আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত হলে তবেই আমরা দক্ষ সরকার পাব, এই বক্তব্যের দ্বারা আমি এটা একেবারেই বোঝাতে চাই নি যে, সেই পরিবর্তন এমনি এমনি আসবে, বা যতদিন না সেই পরিবর্তন আসে, ততদিন আমাদের চুপচাপ বসে থাকতে হবে। এটা সত্যি যে, একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানসিকতার পরিবর্তন ঘটতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু আবার এটাও সত্যি যে, সেই পরিবর্তন নিজের থেকে ঘটে না। পৃথিবীর ইতিহাস সেই কথা বলে না। বরং ইতিহাসে দেখা গেছে, অল্প কিছু মানুষের দীর্ঘদিনের চেষ্টার দ্বারাই সমাজের সামগ্রিক মানসিকতার উন্নতিসাধন হয়েছে। সেই অল্প কিছু মানুষ যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতেন, তাহলে ওই পরিবর্তন কোনদিনই হত না।

এখন আমাদের দেশের মানুষের রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন কে ঘটাবে? যারা নিজেরাই রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত বা কুশিক্ষিত, তারা? নাকি যে মুষ্টিমেয় মানুষ রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত, তারা? নিশ্চয় দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষেরা। আপনি যদি ভারতবর্ষের একজন রাজনৈতিক শিক্ষিত নাগরিক হন, তাহলে মনে রাখুন, এই দেশের প্রতি আপনার একটি গুরুদায়িত্ব আছে। আগামী নির্বাচনগুলিতে কংগ্রেস, বিজেপি বা তৃণমূল কংগ্রেসকে জেতানো আপনার কাজ নয়। আপনার জন্য বরং অনেক বড়ো একটি নির্বাচন অপেক্ষা করে আছে। সেই নির্বাচনের প্রার্থী হল তিনটি মানসিকতা – রাজনৈতিক শিক্ষা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা। আর সেই নির্বাচনে রাজনৈতিক শিক্ষা যাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, প্রতিপক্ষদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে যাকে বলে একদম “ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি” অর্জন করে, তার দায়িত্ব আপনার, এবং আপনার মতো মুষ্টিমেয় কিছু রাজনৈতিক শিক্ষিত নাগরিকের। এই নির্বাচন কিন্তু একদিনে শেষ হওয়ার নয়। এর জন্য দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, লাগতে পারে কয়েকটি প্রজন্ম। কিন্তু এই দীর্ঘ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আপনার অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কিভাবে অংশগ্রহণ করবেন, সেটা পরবর্তী পর্বে বলার চেষ্টা করব। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *