রাজনৈতিক শিক্ষা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা পর্ব – ২

সৌমেন পাত্র

স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে যতগুলি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, মোটের উপর সবগুলিকেই ব্যর্থ বলা চলে। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, এই সরকারগুলি দেশের জন্য কিছুই করে নি। এরা আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে, মোটামুটি ভাবে দেশের ভেতর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করেছে, গণতন্ত্রকে এখনও পর্যন্ত বিসর্জন দেয় নি। কিন্তু এসব প্রাথমিক ব্যাপার বাদ দিয়ে সরকারের যে প্রধান কাজ, অর্থাৎ দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সেই কাজে তারা শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান – এই তিনটি প্রধান বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকটি সরকারই ডাহা ফেল।

অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই সরকারগুলির কোনটিই রাজতন্ত্রের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে আসে নি, একনায়কতন্ত্রের মতো সেনাবাহিনীর অস্ত্রের জোরেও আসে নি। আমরা, ভারতবর্ষের আপামর জনসাধারণ, বুথের সামনে লাইন দিয়ে, গোপন ব্যালট বাক্সে স্বেচ্ছায় ভোট দিয়ে এই সরকারগুলিকে ক্ষমতায় এনেছি যারা কিনা আমাদেরই জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যর্থ। এইখানে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র পৃথিবীর জটিলতম ধাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এই ধাঁধা আর ধাঁধা থাকে না যদি আমরা ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত, অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত নাগরিকের অনুপাতটি লক্ষ্য করি। সেখানে আমরা দেখব, আমাদের অধিকাংশ নাগরিক হয় রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত, নাহয় কুশিক্ষিত। এঁরা হয় রাজনীতি নিয়ে মোটেই মাথা ঘামান না, নাহয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অরাজনৈতিক কারণে কোন দলকে সমর্থন করেন। রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত নাগরিক, যারা কিনা প্রকৃত রাজনৈতিক কারণে কোন দলের সমর্থন বা বিরোধিতা করেন, তাঁরা আমাদের দেশে নিতান্ত সংখ্যালঘু। আর গণতন্ত্রে যেহেতু সংখ্যাই ব্রহ্ম, তাই ভোটের বাক্সে এঁদের মতামতের কোন দাম নেই।

এইখানে সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে – “Every nation gets the government it deserves.” আমরা ভারতীয়রা সেরকম সরকারই পেয়েছি, যার আমরা যোগ্য। আমরা যদি রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত হতে পারতাম, তাহলে নিশ্চয় এরকম ব্যর্থ সরকারগুলিকে আমাদের সহ্য করতে হত না।

সুতরাং আমরা যদি নিজেদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি চাই, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত হতে হবে। তবেই আমরা একটি দক্ষ, দায়িত্বশীল সরকার আশা করতে পারব। এটা অবশ্য কোন নতুন কথা নয়। আমাদের মধ্যে যারা দেশকে নিয়ে সামান্য হলেও ভাবি, তারা সবাই নিশ্চয় মনে মনে এটা উপলব্ধি করেছি। সমস্যাটা বাধে এর পরেই। ধরা যাক, আপনি বিস্তর খেটেখুটে বই পড়ে, কাগজ পড়ে, নেট ঘেঁটে, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে নিজেকে রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত করে তুললেন। কিন্তু তারপর কী হবে? তারপর কী হতে পারে, এক এক করে দেখা যাক।

(১) আপনি অনেক চিন্তাভাবনা করে কোন একটি দল বা প্রার্থীকে যোগ্য মনে করলেন। এবার নির্বাচনের সময় আপনি যদি ওই প্রার্থীকে ভোট দেন, তার ফল কী হবে? উত্তরঃ কিছুই না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আপনার পছন্দের প্রার্থী কখনোই জিতবে না! কারণ ভোটটা তো আর আপনি একা দেন নি। দিয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। আর তাঁদের সিংহভাগই হয় রাজনৈতিক ভাবে অশিক্ষিত, নাহয় কুশিক্ষিত। কাজেই তাঁরা কেউ আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন না। আপনার মতো রাজনৈতিক শিক্ষিত ভোটারের সংখ্যা এতই নগণ্য যে, ভোটবাক্সে আপনাদের মতামতের কোন প্রতিফলন ঘটবে না।

(২) এমনও হতে পারে, আপনার কোন প্রার্থীকেই উপযুক্ত মনে হল না। সত্যি বলতে কি, এরকম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নেতারা তো আকাশ থেকে পড়ে না। জনগণই নেতা তৈরি করে। জনগণের মধ্যে যেরকম নেতার চাহিদা বেশি থাকে, বাস্তবে সেরকম নেতাই উঠে আসে। আপনার মতো মানুষ যেহেতু নগণ্য, তাই আপনার পছন্দের নেতাও উঠে আসবে না। মনে করুন, আপনি পটল খেতে ভালবাসেন। কিন্তু আপনি এমন এলাকায় গেছেন, যেখানে কেউ পটল খায় না। এবার সেখানকার বাজারে গিয়ে যদি আপনি পটল খোঁজ করেন, তাহলে পাবেন কি? এক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আপনি ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রার্থীই খুঁজে পাবেন না। অগত্যা ভোট না দেওয়া কিংবা নোটায় ভোট দেওয়া ছাড়া আপনার আর কোন উপায় থাকবে না।

(৩) এসব দেখে আপনি হয়তো সিদ্ধান্ত নিলেন, আপনি নিজেই ভোটে দাঁড়াবেন। ভালো কথা, দাঁড়াতেই পারেন। কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি কখনোই জয়ী হতে পারবেন না! কারণটা ওই একই। আপনাকে ভোট দেওয়ার লোক কোথায়? যে দেশে কেউ পটল খায় না, সেখানকার বাজারে আপনি এক ঝুড়ি পটল নিয়ে বিক্রি করতে বসে গেছেন!

এবার নিশ্চয় আপনি বিরক্ত হয়ে বলবেন, “দুত্তেরি, দেশের কথা ভেবে কিচ্ছু লাভ নেই। তার চেয়ে বরং আইপিএল দেখি গে।” আমার ধারণা, উপরের ভাবনাগুলি চেতনে বা অবচেতনে মনের মধ্যে কাজ করে বলেই অনেক বুদ্ধিমান ও হৃদয়বান ব্যক্তি রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অশিক্ষিত নাগরিকে পরিণত হন। আমি বলব, এতটা হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আপনি তাৎক্ষণিক ভাবে কিছু করতে পারবেন না ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ভাবে দেশের জন্য আপনার অনেক কিছু করার আছে। কী করার আছে, সেটা পরবর্তী পর্বে বলার চেষ্টা করব। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *