গৌতমের গৃহত্যাগ – মিথ এবং বাস্তব

সৌমেন পাত্র

গৌতম বুদ্ধের যে  ‘জীবনী’-র সঙ্গে আমরা শৈশব থেকে পরিচিত হই সেখানে তাঁর গৃহত্যাগের এরকম বর্ণনা পাওয়া যায়। গৌতম তাঁর সারথির সঙ্গে নগরভ্রমণের সময় একজন জরাগ্রস্ত ব্যক্তি, একজন ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং একজন মৃত ব্যক্তিকে দেখে দুঃখময় জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন। এরপর একদিন একজন প্রফুল্লদর্শন সন্ন্যাসীকে দেখে তিনি সন্ন্যাসজীবনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এর কিছুদিন পরে তিনি একদিন কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে সারথিকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।

ঘটনা হল, উপরের গল্পটি মিথ্যে। কেন মিথ্যে তা একটু পরে বলছি। তার আগে একটা কথা বলা দরকার। এটি শুধু মিথ্যেই নয়, এটি একটি ক্ষতিকর মিথ্যে। এই গল্প থেকে আমরা বুদ্ধ ও তাঁর মতবাদ সম্পর্কে দুটি ভুল ধারণা লাভ করি। প্রথমত, পরিবারের কাউকে কিছু না বলে, তাঁদের সম্মতি আদায় না করে কাপুরুষের মতো রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এই মহামানবের চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করে। দ্বিতীয় যে ভুল ধারণাটি আমরা এই গল্প থেকে লাভ করি, তা আরও মারাত্মক। এই গল্প থেকে আমরা জন্ম ও দুঃখ সংক্রান্ত বুদ্ধের মতবাদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা পাই। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধ জন্ম বলতে বুঝিয়েছিলেন আমাদের ভেতর মিথ্যে আমিত্বের জন্ম ও দুঃখ বলতে এই আমিত্বের জন্ম জনিত দুঃখ। কিন্তু এই গল্প থেকে আমাদের মনে হয় যে, বৌদ্ধধর্ম অনুসারে আমাদের এই পার্থিব জন্মটাই দুঃখের কারণ এবং তার নিবৃত্তির জন্য মৃত্যুর পর আর যাতে জন্ম না হয় তার জন্য চেষ্টা করা উচিত।

মারাঠি পণ্ডিত ধর্মানন্দ কোষাম্বি (ঐতিহাসিক ডি. ডি. কোষাম্বির পিতা) তাঁর ক্লাসিক গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘ভগবান বুদ্ধ’-তে  উপরের গল্পটির অসত্যতা উদ্ঘাটন করেছেন। দেখা যাক, ঠিক কি কারণে বুদ্ধের গৃহত্যাগ সম্পর্কিত বহুল প্রচলিত মতটিকে অসত্য বলা হচ্ছে।

প্রথমত, আমরা যদি এই কাহিনীর সূত্র খুঁজতে শুরু করি, তাহলে দেখব এর আদিসূত্র হল মহাযানী গ্রন্থ ‘ললিতবিস্তর’। এই গ্রন্থেই সর্বপ্রথম এই গল্পটি পাওয়া যায়। প্রখ্যাত কবি অশ্বঘোষ এই ‘ললিতবিস্তর’ অবলম্বন করেই তাঁর অসাধারণ সাহিত্যগুণ মণ্ডিত মহাকাব্য ‘বুদ্ধচরিত’ রচনা করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থে এই গল্প নানাভাবে পরিবেশিত হতে থাকে। এখন ললিতবিস্তরের রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক অর্থাৎ এটি বুদ্ধের পরিনির্বাণের (আনুমানিক ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্ব) প্রায় চারশো বছর পরবর্তী। প্রাচীনতম বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের কোথাও বুদ্ধের নামে এই গল্পের উল্লেখ নেই।

দ্বিতীয়ত, সুত্ত পিটকের অন্তর্গত দীঘনিকায়ে মহাপদান সুত্ত নামে একটি সুত্ত আছে। এখানে বলা হয়েছে, গৌতম বুদ্ধের পূর্বে আরও ছজন বুদ্ধ জন্মেছিলেন। তাঁদের নাম বিপসসী, সিখী, বেসসভূ, ককুসন্ধ, কোণাগম ও কশ্যপ। এই ছয় বুদ্ধ খুব সম্ভবত কাল্পনিক, এঁদের ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণিত নয়। সে যাই হোক, মহাপদান সুত্তে ঐ বিপসসী বুদ্ধের জীবনকাহিনী বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। কি আশ্চর্য, এখানে দেখি জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ও সন্ন্যাসী দেখার গল্পটি হুবহু ঐ বিপসসী ভদ্রলোকের নামে বলা হয়েছে! তাহলে? তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই যে, গল্পটি প্রথমে বিপসসীর সম্পর্কে লেখা হলেও পরবর্তীতে এটিকে গৌতমের উপর আরোপ করে দেওয়া হয়েছে কারণ ললিতবিস্তর দীঘনিকায়ের অনেক পরে লেখা।

তৃতীয়ত, রাতে ঘোড়ায় চড়ে পালানোর ব্যাপারটিও যে মিথ্যে, আমাদের হাতে তার প্রমাণ আছে। মজ্ঝিমনিকায়ের আরিয় পরিয়েষণা সুত্তে বুদ্ধ তাঁর গৃহত্যাগের কথা এইভাবে বর্ণনা করছেন – “আমি তখন তরুণ । আমার একটি চুলও পাকে নাই। আমি পূর্ণ যৌবনে ছিলাম। আমার মাতা-পিতা আমাকে অনুমতি প্রদানে অসম্মত ছিলেন। চোখের জলে স্নেহশীল মাতা-পিতার মুখ ভিজিয়া গিয়াছিল। তাঁহারা অনবরত কাঁদিতে ছিলেন। তাঁহাদের কান্না উপেক্ষা করিয়া, আমি কেশ শ্মশ্রু ছেদন করিয়া, কাষায় বস্ত্র পরিধান করিয়া, গৃহত্যাগ করিয়া অনাগারিক প্রব্রজ্যা গ্রহণ করি ।” হুবহু এই কথাগুলিই আবার মহাসত্যক সুত্তেও বলা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এই বর্ণনা রাতে পালানোর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীটিকে মোটেই সমর্থন করে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *