ইতালির বুকে আশ্চর্য এক দৈত্য গুহা

শুভশ্রী হালদার

ইতালি শুনলেই প্রথম কোন নামটা মাথায় আসে ? ভেনিস, যেখানে “দো লফ্জ ও কি হে দিল কি কাহানি” গানটি ইতালীয় নৌকো বা গন্ডোলায় চড়ে গাওয়া হয়েছিল। নাকি রোম, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে পৃথিবীর অন্যতম ইতিহাস প্রসিদ্ধ সভ্যতা গুলোর একটা, তার সুপ্রাচীন গাম্ভীর্য নিয়ে। ইতালি তার মনুষ্য সৃষ্ট স্থাপত্য বা কারুকার্যের জন্য বেশি পরিচিত হলেও ইতালির বুকে অবস্থান করে আর ও বেশ কিছু সুপ্ত সৌন্দর্য।

প্রায় গামবুটের মতো আকৃতির এই দেশের একদম উত্তরে আড্রিয়াটিক সাগর এর উত্তরপ্রান্তে স্লোভেনিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত ট্রিয়েস্টে শহর। ইতালির উত্তরে এই ট্রিয়েষ্টে শহরের গনিকো (Sgonico) গ্রামে অবস্থিত এই গুহা যার নাম “গ্রোট্টা  জিগান্তে” (Grotta Gigante)। ইতালিয়ান ভাষায় এর অর্থ দৈত্য গুহা। ১৯৯৫ সালের গিনেস বুক অফ রেকর্ডস অনুসারে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম গুহা (বর্তমানে দ্বিতীয়, ফ্রান্সের লা ভার্না গুহার পর) যা জনসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত।

এই বিশাল গুহার প্রধান গ্যালারি  উচ্চতায় ৩৫১ ফুট, দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে ২১৩ ও  ৪৩০ ফুট অর্থাৎ যার মধ্যে প্রায় অন্তত দুটো কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পাশাপাশি ধরে যাবে।

কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল (“গুগল ফটোস” থেকে)

এই গুহা মূলত স্ট্যালাকটাইট (Stalactite) এবং স্ট্যালাগমাইট (Stalagmite) দিয়ে তৈরি। স্ট্যালাকটাইট হল এক গুহার উপর থেকে নেমে আসা পাথরের আকৃতি বিশেষ যা দেখতে অনেকটা বর্শার মত। গুহার উপর থেকে জলের ফোটার মতো পড়ে গুহার নিচের মেঝেতে তৈরি হওয়া স্ট্যালাগমাইট অনেকটা থরে থরে সাজিয়ে রাখা ডিশের মতো আকার ধারণ করে।

স্ট্যালাকটাইট (Stalactite) (নিজস্ব ছবি)

এই দুই ধরণের আকৃতিই তৈরি হয় চুনাপাথর দিয়ে। এই আকৃতি গুলোর নামকরণ হয় এদের তৈরি হওয়ার বিশেষত্ব থেকে। স্ট্যালাকটাইট (Stala’c’tite)  এর ‘C’ কারণ ‘ceiling’ অর্থাৎ ছাদ থেকে নেমে আসে ও স্ট্যালাগমাইট (Stalagmite) এর ‘G’ কারণ ‘ground’ বা মাটির উপর তৈরী হয় এই আকৃতি-গুলো।  

স্ট্যালাগমাইট (Stalagmite) (নিজস্ব ছবি)

এই দৈত্য গুহার ভিতরে যাওয়ার সময় পাবেন একজন দক্ষ গাইড। যিনি আপনাকে নিয়ে গুহার প্রবেশপথ দিয়ে নিয়ে যাবেন প্রথম গ্যালারিতে। এই প্রবেশপথ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি। সেখান থেকে আস্তে আস্তে নামতে হবে জলে ভেজা সিঁড়ি বেয়ে গুহার ভিতরে। যদিও জলে ভেজা তাতেও পড়ে যাওয়ার ভয় নেই, কারন সিঁড়ি গুলো অ-পিচ্ছিল আস্তরনে ঢাকা। সম্পূর্ণ গুহার প্রদর্শনী শেষ করতে প্রায় ৮৫০ মিটার অতিক্রম করতে হবে। গুহার ভিতরের তাপমাত্রা শীত অথবা গ্রীষ্ম সবসময়ই থাকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মুখ্য গ্যালারির দিকে (“গুগল ফটোস” থেকে)

এই সিঁড়ি দিয়ে প্রায় ৫০০ সিঁড়ি নেমে পৌঁছে যাবেন সবথেকে বড় গ্যালারিতে যেটা প্রায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৬০ ফুট নিচে, মুগ্ধ হবেন এই বিশালতা দেখে। দর্শকরা ভূপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ৩৩১ ফুট নিচে নামতে পারেন। পুরো গুহাতেই আপনি দেখতে পাবেন চুনাপাথরের তৈরি অনেক ধরনের আকৃতি (structure or formation), গাইড আপনাকে দিতে থাকবেন এই গুহার জন্ম ও পরিচিতি। সিঁড়ি ভেঙ্গে আপনি পৌঁছে যাবেন আকৃতিতে একটু ছোট গুহার অন্য একটি অংশে, যেখানে রয়েছে র একটি গুহার গুপ্ত প্রবেশপথ। এই গুপ্ত গুহাটি ভূগর্ভের প্রায় ৮২৬ ফুট নিচে অবধি বিস্তৃত।

গুহার ভিতরের রাস্তা(“গুগল ফটোস” থেকে)

এই গুহার আবিস্কার যদিও অনেকটা আকস্মিকভাবেই। যদিও গুহার বর্তমান বাহিরপথ পরীক্ষা করে ভূতত্ববিদরা জানতে পেরেছেন যে এই গুহাতে নিওলিথিক যুগ থেকেই মানুষ এবং বিভিন্ন প্রাণীর আনাগোনা ছিল। তবুও গুহার বর্তমান পরিমাপ সমন্ধে বিশেষ কোন ধারনা ছিল না বর্তমান মানুষের। সেটা প্রায় ১৮৪০ সালের কথা, ক্রমবর্ধমান ট্রিয়েস্টে শহরে তখন দেখা দিয়েছে পানীয় জলের অভাব।

গ্রোট্টা  জিগান্তে মিউসিয়াম এ গুহা ভাল্লুক (“গুগল ফটোস” থেকে)

গুহার এই বাহিরপথ দিয়েই অ্যান্টন ফ্রেডেরিক লিন্ডনার একটা দড়ি আর মোমবাতি নিয়ে নেমেছিলেন টিমাভো নদীর খোঁজে, যাতে করে খানিক টা হলেও শহরের জলসমস্যা মেটে। যদিও সে কাজ সফল হয়নি। ১৮৯০ এবং ১৯০৫ সালে আবিস্কার হল গুহার দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রবেশপথ। এর ঠিক তিন বছর পরেই গুহার দরজা খুলে দেওয়া হল সাধারন মানুষের জন্য।

অ্যান্টন ফ্রেডেরিক লিন্ডনার (গ্রোট্টা  জিগান্তে ওয়েব)

এই গুহা তথা ট্রিয়েস্টের ভূগোল ও বেশ আকর্ষণীয়। চুনাপাথর ও কার্বনেট দিয়ে তৈরী “কার্সো ট্রিএস্টিন” যা পুরো ট্রিয়েষ্টে শহরকে ঘিরে রাখে তারই এক প্রান্তে এই গ্রোট্টা জিগান্তে। প্রায় ১২ কোটি বছর থেকে ৪ কোটি বছর আগে ধীরে ধীরে প্রাণীর খোলস জমে এবং তাপ ও ওপরের পাথরের চাপে রূপান্তরিত হয়ে চুনাপাথরে পরিণত হয়। চুনাপাথর ও জল এর বিক্রিয়ায় কোটি কোটি বছর ধরে এই তৈরি হয় এই সম্পূর্ণ গুহা ও গুহাসম্বলিত পাহাড়সমগ্র।

ট্রিয়েস্টের কারস্ট চুনাপাথরের পাহাড় (নিজস্ব ছবি)

প্রায় ১ কোটি বছর আগে “গ্রোট্টা জিগান্তে” তৈরি হওয়া শুরু হয়। মাটির নীচে বয়ে চলা নদীর ক্ষয়কাজ চলে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ বছর ধরে। পরবর্তীকালে নদী যখন আরো গভীর নদীখাতে প্রবাহপথের পরিবর্তন করে, তখন ধীরে ধীরে সৃষ্টি করে এই‌ গুহার পরিবেশ। একথা বলাই বাহুল্য, গুহার ভেতরে থাকাকালীন যখন আপনি শুনবেন যে আপনি যেখানে রয়েছেন,  ঠিক তার নীচেই বয়ে চলেছে এক আদিম নদী টিমাভো, তার সুপ্ত জলধারা নিয়ে যা প্রতিনিয়ত এক অবিরাম খননকার্য করে তৈরী করেছে এই‌ সুবিশাল গুহা, এক‌ মূহুর্তের জন্য হলেও মনে শিহরণ খেলে যাবে প্রকৃতির ক্ষমতার কথা স্মরণ করে। পরের ৩০-৪০ লক্ষ বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে এই বৈচিত্র্যময় কারূকার্য,‌ যা গুহার বর্তমান পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।  

স্ট্যালাগমাইট এর স্তূপ (নিজস্ব ছবি)

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আপনি দেখতে পাবেন পুরো গুহার সম্পূর্ণ গ্যালারি। যদিও এখনো অবধি গুহার সৃষ্টি সম্পূর্ণ হয়নি। ক্রমবর্ধমান স্ট্যালাগটাইট এর ফলা,‌ স্ট্যালাগমাইট এর স্তূপই তার সাক্ষ্য বহন করে। মোটের উপর ট্রিয়েস্টের এই গুহা এই শহরকে এক অনন্য ভৌগলিক মাত্রা এনে দেয় এই বিশাল দৈত্যকার উপস্থিতি নিয়ে। এমন এক সৌন্দর্য যা অন্য অনেক শহরেই অনুপস্থিত।

(সহযোগিতায় অরুনেষ রায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *