বুদ্ধ কথন – পর্ব ৩

পড়ে নিন… বুদ্ধ কথন – পর্ব ২

সৌমেন পাত্র

– তুই বলছিস, ধর্মের মূল কথা নাকি আমিত্ব ত্যাগ। অথচ ধর্ম বলতে আমরা কিন্তু সাধারণভাবে বুঝি ঈশ্বর, দেবদেবী, স্বর্গ-নরক, আত্মা, জন্মান্তর ইত্যাদি। এই দুটো ব্যাপারকে আমি একসাথে মেলাতে পারছি না। প্রথমটাও ধর্ম, আবার দ্বিতীয়টাও ধর্ম, এটা কী করে হয়?

– ঠিকই বলেছিস। ধর্ম বলতে আমরা সাধারণত আমিত্ব ত্যাগকে বুঝি না। ঈশ্বর, আত্মা ইত্যাদি কাল্পনিক ধারণাগুলোকে বুঝি। আসলে এইসব ধারণাগুলোও কিন্তু আমাদের মিথ্যে আমিত্বের ধারণা থেকেই এসেছে।

– তাই নাকি? কিভাবে?

– দ্যাখ, ওইসব কাল্পনিক ধারণাগুলোকে তুই মোটামুটি দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারিস। একটা হল, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস যার মধ্যে আসবে আত্মা, জন্মান্তর ও স্বর্গ-নরক। আরেকটা হল কোন একটা অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস – তা নিরাকার ঈশ্বর হতে পারে, কিংবা সাকার দেবদেবী।

– বেশ। তারপর?

– এবার তুই যদি ভেবে দেখিস, এই দু’ধরণের বিশ্বাসই আমিত্ব থেকে এসেছে। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ধারণা এসেছে আমিত্বকে সংরক্ষণ করার (self-preservation) বাসনা থেকে। মানুষ যখন আমিত্বে বিশ্বাস করে, তখন সে কিছুতেই মানতে চায় না যে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার এই প্রিয় ‘আমি’টি চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। এর থেকেই সে আত্মা, জন্মান্তর ইত্যাদির কল্পনা করে নিজেকে প্রবোধ দেয়। আবার অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস এসেছে আমিত্বকে রক্ষা করার (self-protection) তাগিদ থেকে। একজন সর্বশক্তিমান কেউ সর্বদা আমাকে রক্ষা করবে, এই বাসনাই তো ঈশ্বরের ধারণার জন্ম দিয়েছে।

– তোর যুক্তিটা মানলাম। কিন্তু এই যুক্তি মানতে হলে তো বলতে হয়, ঈশ্বর, আত্মা ইত্যাদি যেসব ধারণাকে আমরা ধর্ম বলে জানি, সেগুলো তোর মতে প্রকৃত ধর্ম, অর্থাৎ আমিত্ব ত্যাগের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। সেক্ষেত্রে এগুলোকে আর ধর্ম বলা যাবে কিভাবে?

– বলা যাবে। এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। যে আমিত্ব থেকে এসব কাল্পনিক ধারণাগুলো এসেছে, এগুলি আবার সেই আমিত্বকেই নাশ করতেও পারে।

– কিভাবে?

– প্রথমত, তুই যখনই নিজের চেয়ে অনেক বড়ো কোন শক্তিকে মন থেকে স্বীকার করছিস, সেই মুহূর্তেই তোর আমিত্বের বোধ কিছুটা হলেও খর্ব হচ্ছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। তুই যখন বিশ্বাস করছিস, এই বিশ্বজগত এক ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং তুই, আমি, আমরা সবাই আসলে স্বতন্ত্র কেউ নই, সেই এক ঈশ্বরেরই অংশ মাত্র, তার মানে তোর যে স্বতন্ত্র আমিত্বের বোধ, সেটা আর আদৌ শক্তিশালী থাকছে না। ঈশ্বরের মধ্য দিয়ে তুই নিখিল বিশ্বের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিস। এই কারণেই কেউ যদি ঈশ্বরভাবনার চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে পারে, তাহলে তার আমিত্বের বোধ আর একেবারেই থাকবে না। এই দর্শনটা ঈশ্বরকেন্দ্রিক সব ধর্মেই মোটামুটি আছে, তবে আমাদের উপনিষদে, বিশেষ করে উপনিষদের অদ্বৈত ভাষ্যে এটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, “আমিই ব্রহ্ম”। অর্থাৎ আমাতে আর ব্রহ্মে কোন প্রভেদ নেই, আমরা আসলে এক ও অভিন্ন। বুঝতেই পারছিস, এরকম একটা উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারলে তোর আর স্বতন্ত্র আমিত্ব বলে কিছু থাকার কথা নয়। রামকৃষ্ণ যাকে বলেছেন, “ছোট আমি” গিয়ে “বড়ো আমিতে” লীন হয়ে যায়।

– তার মানে বুদ্ধও যা বলেছেন, উপনিষদ ও অন্যান্য ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মও তাই বলেছে?

– হ্যাঁ, মোদ্দা কথাটা একই। তবে উপনিষদে যে কথাটাকে আত্মা ও ব্রহ্মের মতো কাল্পনিক ধারণার উপর ভিত্তি করে ঘুরিয়ে বলা হয়েছে, বুদ্ধ সেই কথাটাই একদম সরাসরি বলেছেন, কোনরকম metaphysical baggage ছাড়া।

– তোর কথা শুনে যা বুঝলাম, আমিত্ব নাশের দুটো বিকল্প পথ আছে। কেউ যদি কঠোরভাবে যুক্তিবাদী হয়, প্রমাণ ছাড়া কোনকিছু মানতে না চায়, তাহলে তাকে বুদ্ধের পথ ধরেই এগোতে হবে। আর কেউ যদি কিছু কিছু যুক্তিহীন ধারণাকে মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে সে উপনিষদের পথও ধরতে পারে।

– একদম ঠিক বলেছিস।

– কিন্তু আমার মনে একটা সন্দেহ উঁকি মারছে। এই যে সব বড়ো বড়ো দর্শন, এগুলো কি বাস্তবে আদৌ কার্যকরী? তাহলে চারপাশে যুক্তিবাদী ও বিশ্বাসী উভয় ধরণেরই এত যে মানুষ দেখি, তাদের তো দেখে মনে হয় না যে, তারা আমিত্ব ত্যাগ করে ফেলেছে। তাহলে মানুষের মধ্যে এত লোভ, হিংসা, অহংকার, স্বার্থপরতা কেন? আমিত্ব ত্যাগ করলে তো এগুলো থাকার কথা নয়।

– খুব ভালো পর্যবেক্ষণ। আসলে আমিত্ব হল একটা রোগ যার উপসর্গ ওই লোভ, হিংসা ইত্যাদি। রোগকে তো সরাসরি দেখা যায় না, উপসর্গ দেখেই তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। আর এক্ষেত্রে সত্যিই উপসর্গের কোন অভাব নেই।

– তাহলে সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে?

– তুই যে দুটো বিকল্প পথের কথা বললি, ওই দুই পথের পথিকেরাই একটা জায়গায় গিয়ে থেমে যায়, পথটা কেউই সম্পূর্ণ করে না। যারা বিশ্বাসের পথিক, তারা বাইরের বড়ো আমিতে বিশ্বাস করে কিন্তু ভেতরের ছোট আমিকেও বিসর্জন দেয় না। আবার যুক্তিপথের পথিকরা বাইরের বড়ো ভগবানে বিশ্বাস করে না কিন্তু নিজের ভেতরের ছোট ভগবানটিকে সযত্নে লালন করে, যদিও সেটাও একই রকম অযৌক্তিক।

– হুঁ, পথটা কেউই সম্পূর্ণ করে না। সেটাই সমস্যা। (শেষ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *