সত্যিকারের বন্ধুত্ব

প্রিয়াশ্রী কর

আশ্চয্যি এক মেয়ে ছিল! নাম তার উর্মিমালা। সে যেমন সুন্দরী, তেমন চঞ্চল, তেমনি তার গভীর মনের ভেতর বুকভরা টলটলে ভালোবাসা। সে মেয়ের আরও অনেক নাম ছিল। সাগর, সমুদ্র এ সব নামেই মানুষ তাকে বেশী চিনত। কিন্তু উর্মির একটুও পছন্দ ছিল না সে সব নাম। ও সব তো ছেলেদের নাম! সে না মেয়ে! তার কোমল শরীর ছিল নোনতা জলে গড়া, কাঁচের মত স্বচ্ছ। দিনে সূয্যি আর রাতে চাঁদ যখন আকাশে হরেক রঙের দোল খেলত, সেই রঙে শাড়ী বুনে পড়ত সে। আশ্চর্য জাদু দিয়ে তৈরী সে সব শাড়ী! সূয্যি ওঠার সময় শাড়ীর রঙ থাকত সিঁদুরে লাল। সারাদিন রামধনুর মত তাতে খেলা করত সোনালী, সবুজ, নীল আরও কতই না রঙ! তার পর সূয্যি ডোবার ঠিক আগে কমলা রঙে রেঙে উঠত সে শাড়ী। রাতের বেলায় চাঁদ উঠলে শাড়ী সাজত কালোর ওপর রূপোলী কাজের জমকালো সাজে। আবার অমাবস্যার আঁধার রাতে আঁধার রঙ খেলত সে শাড়ীতে। একটি শাড়ী একটি দিন পরেই রেখে দিত উর্মি, পরের দিনের নতুন রঙে নতুন করে শাড়ী বুনত। দিনেরাতে সর্বক্ষণ খুশী থাকত উর্মিমালা। শরীরে তার সারাক্ষণ খেলে যেত আনন্দের ঢেউ। আকাশরঙা শাড়ী পরে সারাটাক্ষণ মনের আনন্দে ছন্দে ছন্দে নাচ করত সে। সেই খুশী তার মনের গভীরে জমে জমে তৈরী হত চুনী, পান্না, মুক্তো, প্রবাল আরও কতই না রংবেরঙের মণিমাণিক্য।

চঞ্চলা উর্মিমালার যেখানে বাড়ি, তার পাশেই ছিল শান্ত ছেলে হিমাদ্রির বাস। সে যেমন রূপবান, তেমন ধীর, তেমনি উদার। তারও অনেক নাম ছিল। মানুষ তাকে সবথেকে বেশী চিনত পাহাড় নামে। চুপচাপ ছেলেটা তো কোনোদিন তাদের মুখ ফুটে বলেনি যে হিমাদ্রি নামটাই তার সবথেকে পছন্দের! সে ছেলে এমনি লাজুক যে আকাশের সাথে রঙ মিলিয়ে প্রতিদিন পোশাক বদলাতে তার ছিল ভারী লজ্জা। দুটোই মাত্র পোশাক ছিল তার, একটি দিনের আর একটি রাতের। দিনের বেলায় মেটে রঙের ওপর সবুজ দিয়ে জমকালো নকশা কাটা ভারী আলোয়ানে নিজের মাটি পাথরে শক্ত করে গড়া শরীরটাকে জড়িয়ে রাখত ছেলেটা। রাতে অবিশ্যি সবার চোখের আড়ালে আঁধার রঙা আলোয়ান পরে সে মিটিয়ে নিত তার আকাশরঙে সেজে ওঠার গোপন সাধ। কখনও রাগত না হিমাদ্রি। ঠাণ্ডা মাথার ছেলে ছিল সে, বরফ দিয়ে গড়া তার মাথা।

এখন এই ছটফটে উর্মিমালা আর শান্ত হিমাদ্রির মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব, গভীর ভালোবাসা। কত রকমেরই না গল্প হত তাদের মধ্যে! তুমি আমি কিন্তু সে সব কথা বুঝব না। বাতাস ওদের দু’জনেরই খুব বন্ধু ছিল কিনা, তাই উর্মির ছলছলাৎ শব্দের ভাষা বয়ে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিত হিমাদ্রির কানে। কত কথা যে বলার থাকত উর্মির! সারাদিনে যতকিছু দেখল, তার সবটুকু হিমাদ্রিকে না বলা অবধি শান্তি নেই তার। হিমাদ্রি বেশীরভাগ সময় চুুুপচাপ সে সব গল্প শুনত আর ভারী মজা পেত। কদাকচ্চিত তার মনে কোনো কথা এলে বাতাসের কানে কানে বলে পাঠাত উর্মির কাছে। একদিন মজা করে উর্মিকে রাগাতে যেই না বলেছে ‘রোজ কি যে এত কথা থাকে তোমার, আর এত ছটফটই বা কি করে কর, বুঝি নে বাপু’, উর্মি অমনি লজ্জা পেয়ে হিমাদ্রির গায়ে নোনতা জলের এক ঝাপটা মেরে ‘যাঃ’ বলে পগারপার। কিছুক্ষণ পরে আবার ফিরে এসে অভিমানভরে বলে ‘তুমি আমার চঞ্চলতাই দেখলে, গভীরতাটা দেখলে না! এত যে রোজ গল্প করি, তবু আমার গভীরে রোজ কত কি ঘটে চলে, সূয্যির আলোয় আমার চুনী, পান্না, মুক্তোরা কত রঙের খেলা খেলে, সে সব কথা তোমায় ঠিক করে বুঝিয়েই উঠতে পারি না। সে তো আর তুমি কখনও দেখতে পাবে না!’ হিমাদ্রি অমনি মিষ্টি হেসে বলে ‘তা কি আর জানি নে? তাই তো রোজ এত কৌতুহল নিয়ে চুপচাপ শুনি বসে তোমার গল্প।’ ব্যাস, অমনি উর্মির রাগ গলে জল। খিলখিলিয়ে হেসে উঠে আবার গল্প জুড়ে দেয় সে।

আবার একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিতেও ওদের জুড়ি নেই। সারাদিন ধরে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ কেউ ধুলোপায়ে, কেউ বা জুতো পায়ে হিমাদ্রির পা মাড়িয়ে হেঁটে যায়। সারাদিনের অত্যাচারে হিমাদ্রির পা কেটে যায়, জ্বালা করে। তবু শান্ত, উদার হিমাদ্রি চুপচাপ হাসিমুখে সবটুকু সহ্য করে। কিন্তু বন্ধু উর্মি এতে ভীষণ দুঃখ পায়। সে তার নোনতা জলের শরীর নিয়ে এসে আছড়ে পড়ে হিমাদ্রির পায়ে, তার ব্যথা ধুইয়ে দেবে বলে। কিন্তু কাটা পায়ে নোনতা জল পড়তে না চাইতেও ব্যাথায় কাতরে ওঠে হিমাদ্রি। সাথে সাথে বুঝতে পারে উর্মি। দুঃখে তার মন ভরে ওঠে। বলে ‘আমি বড় অভাগী বন্ধু, তোমার ব্যাথা কমাতে গিয়ে খালি বাড়িয়ে তুলি।’ হিমাদ্রি কাতর স্বরে বলে ওঠে ‘তুমি আমার দুঃখে ছুটে না এলে আমার যে আরও বেশী কষ্ট হত উর্মি!’ তবু সান্ত্বনা পায় না উর্মি, মনের দুঃখে সে ফিরে যায়। সে জানতে পারে না, ব্যাথা সত্ত্বেও যতটা পারে নোনা জল হিমাদ্রি ধরে রেখে দেয় নিজের শরীরে। যতক্ষণ না উর্মি আবার ফিরে আসছে, বন্ধুর এই চিহ্নটুকু নিয়েই যে কাটাবে সে! বেশীক্ষণ অবশ্য দূরে থাকতে পারে না উর্মি। আবার ফিরে আসে। বলে ‘তুমি কত উদার, বন্ধু, সকলের দেওয়া এত যন্ত্রণা তুমি মুখ বুজে সহ্য কর!’ হিমাদ্রি বলে ‘তুমি যে মানুষের যন্ত্রণা ভোলাতে কি কর, ভেব না তা আমি জানি না। তোমার মত মিষ্টি একটা মেয়ের জলে তৈরী কোমল শরীর যে কেন নোনতা তা আমি জানি।’ এই শুনে চঞ্চল উর্মি হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়, কোনো কথা না বলে চুপচাপ হিমাদ্রির কথা শুনতে থাকে। হিমাদ্রি বলতে থাকে ‘দুঃখী যত মানুষ মনের সকল বেদনা ধুতে তোমার মধ্যে ডুব দেয় আর তাদের চোখের নোনতা জল তোমার শরীরে মেশে। কত দিন ধরে কত মানুষের চোখের জল মিশে মিশেই না তুমি আজ নোনতা হয়ে গেছ!’ চুপ করে থাকে উর্মিমালা। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলে ‘সত্যি মানুষ বড় দুঃখী। ওদের দুঃখের কথা শোনার কেউ নেই! যখন দুঃখে ওদের দম আটকে আসে, তখনি ওরা আমাদের কাছে ছুটে আসে ক’দিন একটু দুঃখ ভুলতে। তুমি আমি যদি ওদের দুঃখ ভাগ করে না নিই, তো বেচারারা যায় কোথায়…!’ চুপ থাকে হিমাদ্রি, মনে মনে তাল মেলায় উর্মির কথায়।

এমনি করেই সুখে দুঃখে দুই বন্ধুর দিন কাটছিল। কিন্তু এর মধ্যে আরও দু’জন যে উর্মিমালার বন্ধু হতে চাইছিল, উর্মিকে কাছে বসিয়ে তার সাথে গল্প করতে চাইছিল, তার খোঁজ না রাখত উর্মি, না জানত হিমাদ্রি। উর্মি আপন খেয়ালে আকাশের রঙে শাড়ী বুনে পড়ে। কিন্তু সে রঙ যে রবি আর শশী আকাশকে দিয়েছে, এতটা সে ভেবে দেখেনি। কি বললে? রবি আর শশীকে তোমরা চেন না? খুব চেন। চিনিয়ে দিলেই চিনতে পারবে। আসলে রবি আর শশী হল গিয়ে সূয্যি আর চাঁদের পছন্দের নাম। হ্যাঁ গোঁ হ্যাঁ, আমাদের উর্মিমালা আর হিমাদ্রির মত সকলেরই পছন্দের নাম আছে! মানুষই শুধু সে কথা না বুঝে তাদের আপন খুশী মত নামে ডাকে। সে যাই হোক, রবি আর শশী সারাক্ষণ আকাশে ভেসে বেড়ায় আর দেখে তাদের থেকে রঙ নিয়ে শাড়ী বুনে পড়ে উর্মি। এই না দেখে রবি, শশী দু’জনেই ভাবে উর্মি হয়তো তাদের খুব ভালোবাসে, তাদের বন্ধু হতে চায়, তাদের কাছে যেতে চায়। তারাও তাই চায় উর্মিকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে। রোজ রাতে তাই শশী তার যত শক্তি আছে সব দিয়ে উর্মিকে নিজের দিকে টানে। এদিকে উর্মি যে কোনোভাবেই বন্ধু হিমাদ্রিকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না! সে কথা উর্মি প্রাণপণে চিৎকার করে বোঝাতে চায়, কিন্তু শশী অনেক দূরে থাকে কিনা, তাই উর্মির সে কথা অতদূরে তার কানে পৌঁছয় না। উর্মি প্রাণপণে বাসা আঁকড়ে পড়ে থাকে, দাঁত চেপে সহ্য করে প্রবল টানের যন্ত্রণা। এ দিকে শশী অপেক্ষা করে কবে পূর্ণিমা রাতে আকাশে ভাসতে ভাসতে সে উর্মির বাসার সবথেকে কাছে আসবে। জানে, সেদিন সে তাকে সব থেকে জোরে কাছে টানতে পারবে। রবিও যত পারে শক্তিতে টানে উর্মিকে কিন্তু রবির বাসা যেহেতু আরও অনেক দূর, তাই তেমন জোরে টানতে বল পায় না সে। উর্মির খুব একটা কষ্ট হয় না তার টানে। রবিও মনের দুঃখে চুপচাপ দিন গোণে গরমকালের জন্য, যখন সে আকাশে ভেসে ভেসে উর্মির সবথেকে কাছে গিয়ে পড়বে।

হিমাদ্রির কাছে সব গল্পই করত উর্মি। রবি, শশীর কথা শুনে সে বলত ‘তুমি কি ভাব শুধু ওরাই টানে তোমায়? আর আমি তোমায় শক্ত করে ধরে রাখিনি নিজের কাছে? কোনও চিন্তা নেই তোমার বন্ধু, আমার টান কাটিয়ে তোমায় নিয়ে যেতে পারবে না রবি শশী। খালি তোমার যে কষ্টটা হচ্ছে তা দূর করার উপায় যে আমার জানা নেই…’ এই বলে অসহায় চোখে সে চেয়ে থাকত উর্মির দিকে। এমনি ভাবে দিন কাটতে থাকে। এক রাতে হিমাদ্রি চুপচাপ আপন খেয়ালে ডুবে আছে এমন সময় উর্মি হঠাৎ প্রবল বেগে এসে আছড়ে পড়ল তার বুকে। চমক ভেঙে উঠে হিমাদ্রি দেখে শশীর ভীষণ টানে যন্ত্রণায় উর্মি পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে হিমাদ্রি দেখে গোল থালার মত রূপোলী ঝকঝকে শশী উর্মির দিকে চেয়ে হাসছে। সে হাসির জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারিধার। অপরূপ সুন্দর পূর্ণিমা রাত এসে গেছে। সুন্দর কিন্তু ভয়ঙ্কর! অন্তত উর্মি আর হিমাদ্রির জন্য। কারণ শশী আজ উর্মির সবচেয়ে কাছে, যে শক্তিতে আজ সে তাকে টানছে, তেমনটা অন্য কোনো রাতে উর্মিকে সইতে হয়নি! ভয়ানক যন্ত্রণায় ছটফট করতে উর্মি হিমাদ্রিকে বলে ‘আজ রাতটা আমার সাথে একটু জেগে থাক তুমি, ভীষণ এ যন্ত্রণা আর সইতে পারছি না! তোমার সাথে গল্প করলে কোনভাবে কেটে যাবে রাতটা।’ হিমাদ্রি তার যন্ত্রণা আর দেখতে পারে না! সে বলে ওঠে ‘এত কষ্ট সহ্য কোর না তুমি, চলে যাও বরং শশীর কাছে।’ ক্লান্ত হেসে উর্মি বলে ‘ভুলে গেছ বন্ধু কি বলেছিলে? তোমার টান কাটিয়ে যাওয়া যে আমার পক্ষে অসম্ভব! তাই তো এত কষ্ট সয়েও মনের আনন্দে আছি, অন্তত তোমার কাছে তো আছি এইটুকু সান্ত্বনা নিয়ে।’ সারারাত ধরে যন্ত্রণায় উথাল পাথাল করে উর্মি, বারবার হিমাদ্রির বুকে এসে আছড়ে পড়ে। হিমাদ্রি সারারাত বুকে আগলে রাখে তাকে।

দিন আবার কাটতে থাকে। ধীরে ধীরে শীত পেরিয়ে বসন্ত, বসন্ত পেরিয়ে গরমকাল শুরু হয়। রবি আকাশে ভাসতে ভাসতে একটু একটু করে উর্মির কাছে আসতে থাকে। মনে মনে ভাবে আরেকটু কাছে গেলেই সে উর্মিকে কাছে টেনে নিতে পারবে। সে জানত যে শশীর মত কাছে সে কখনোই যেতে পারবে না, কিন্তু তার গায়ের জোর শশীর চেয়ে অনেক বেশী কিনা, তাই তার মনের জোরও ছিল খুব। কিন্তু দিনের পর দিন কেটে গেল, রবি যতটা সম্ভব উর্মির কাছে চলে এল, তাও সে এতই দূর যে রবি যত জোরেই টানুক না কেন, উর্মি টেরটি পেল না! এতদিনের অপেক্ষাকে এইভাবে বৃথা হয়ে যেতে দেখে ভীষণ দুঃখে, মনের প্রবল যন্ত্রণায় রবি জ্বলতে শুরু করল। এমন ভয়ানক সেই জ্বালা যে আকাশ পেরিয়ে, বাতাস পেরিয়ে উর্মির গায়ে এসে তার আঁচ লাগল। ভয়ানক সেই আঁচে সারা শরীর তার পুড়ে যেতে লাগল। তার জলের শরীর থেকে জলের কণারা ছিঁড়ে বেরিয়ে জমাট বেঁধে মেঘ হয়ে বাতাসে ভাসতে লাগল। ভীষণ পিপাসায় তার গলা, বুক শুকিয়ে উঠল। এ কি ভীষণ অসুখ হল তার! কার কাছে যায় সে তখন! তার সব সুখ দুঃখের একমাত্র সাথী হিমাদ্রির কাছেই গিয়ে কেঁদে পড়ল। ‘বন্ধু বাঁচাও! এমন যন্ত্রণা আগে কোনোদিন পাইনি! কিছু একটা কর, আর যে জ্বালা সইতে পারছি না!’ বন্ধুর যন্ত্রণা দেখে সদা শান্ত, হিমশীতল মাথা হিমাদ্রিরও চোখ ফেটে জল এল। তার দু’চোখ বেয়ে হিমশীতল জলের ধারা নেমে প্রবল বেগে ধেয়ে যেতে লাগল উর্মির দিকে। এদিকে নিজের কষ্টের কথা হিমাদ্রিকে বলতে এসে উর্মি দেখে রবির যন্ত্রণার আগুনে হিমাদ্রিও ভীষণভাবে পুড়ে যাচ্ছে! তার আলোয়ানের জমকালো সবুজ নকশা সবার আগে পুড়ে ফিকে হয়ে এসেছে আর তার সারা শরীর এত গরম হয়েছে, যেন আগুন ধরে গেছে। অথচ সেদিকে খেয়ালই নেই তার, উর্মির কষ্টে তার দু’চোখে তখন জলের অঝোর ধারা। কিন্তু হিমাদ্রির কষ্ট দেখে উর্মি তো তখন নিজের কষ্ট ভুলে দুর্ভাবনায় পাগলপারা। কি উপায় করে সে? অনেক ভেবে একটা বুদ্ধি বার করল সে। তাদের দুই বন্ধুর বরাবরের সুখ দুঃখের সাথী সমীরণ, যাকে কিনা আমরা বাতাস বলে বেশী চিনি, তাকে ডেকে উর্মি বলল ‘বন্ধু, আমার শরীর জ্বলে তৈরী এই মেঘকে সাথে নিয়ে উড়ে যাও বন্ধু হিমাদ্রির কাছে, তার শরীর তাক করে ছুঁড়ে দাও এই মেঘ। তাতে মেঘ ভেঙে যাবে, বন্ধু আমার স্নানের জল পাবে, তার পোড়া শরীর জুড়োবে। এ কথা শুনে সমীরণ সাথে সাথে মেঘকে তুলে নিয়ে উড়ে গিয়ে সজোরে আছাড় মারল হিমাদ্রির গায়ে। তা থেকে ঝমঝমিয়ে নেমে এল মিষ্টি জলের বৃষ্টিধারা। সেই জলে স্নান করে হিমাদ্রির শরীরের সকল জ্বালা জুড়িয়ে গেল। মনে মনে সে ভাবতে লাগল দুঃখের আগুনে পুড়ে বন্ধু উর্মির নোনতা জল কেমন মিষ্টি হয়ে গেছে! ওদিকে হিমাদ্রির হিমগলা হিমশীতল চোখের জলের ধারায় ততক্ষণে উর্মির পিপাসা আর শরীরের সব জ্বালা মিটে তার প্রাণ জুড়িয়েছে।

সেই রাতে দুই প্রাণের বন্ধু আবার চুপচাপ আগের মত গল্প জুড়েছে। বৃষ্টির জলে ঠান্ডা হয়েছে সমীরণও, মনের আনন্দে সে দুই বন্ধুর সকল কথা পৌঁছে দিচ্ছে পরষ্পরের কানে, বরাবরের মত। হিমাদ্রি ভিজে, নরম গলায় বলে ওঠে ‘তুমি যা কষ্ট পেলে উর্মি, সে কথা ভাবতে আমার দুঃখে বুক ভেঙে যাচ্ছে!’ উর্মি তার মধুর, মায়াজড়ানো গলায় উত্তর দেয়, ‘কষ্ট তুমিও বড় কম পাওনি! কিন্তু মাঝে মাঝে কষ্ট পাওয়ারও অনেক ভালো দিক থাকে। এই কষ্ট আমাদের অনেক কিছু দিয়ে গেছে। আগে আমরা ছিলাম শুধুই সুখদুঃখের গল্প করার সাথী। কিন্তু এখন আমাদের বন্ধুত্ব আরও অনেক বড় হয়ে গেছে! নিজেদের বিপদ তুচ্ছ করেও আমরা একে অপরের বিপদে পাশে থাকতে পেরেছি। একে অপরের মধ্যে খানিকটা করে মিশে গেছি আমরা! আর কোনোদিন আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। আসল বন্ধুত্ব তো এমনই হয়! ঠিক কিনা?’ হিমাদ্রি বরাবরের মত নিশ্চুপের ভাষায় বুঝিয়ে দিল, সে কথা বুঝতে তার আর কিছুই বাকি নেই…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *