আলো গিলে নেওয়া কৃষ্ণগহ্বর (ব্ল্যাক হোল) এর মুখ অবশেষে দেখতে পেলেন বিজ্ঞানীরা

এই প্রথম বারের জন্য বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন সেই মহাজাগতিক দৈত্যকে যা কি না আলো কেও গিলে ফেলে তার প্রবল শক্তি দিয়ে। “ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ” টীমের বিজ্ঞানীরা তার ছবি তুললেন বেতার তরঙ্গের সাহায্যে। ২০১৯ এর এপ্রিল মাসের ১০ তারিখটা জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান তথা সমগ্র পৃথিবীর মানুষের কাছে এক অবিস্মরনীয় দিন হয়ে থাকবে এই ব্ল্যাক হোল এর প্রথম ছবির শিরোপা নিয়ে। এই লেখাতে আমরা জেনে নেব কৃষ্ণগহ্বর আসলে কী ও কিভাবে এর সৃষ্টি হয়, কিভাবে বিজ্ঞানীরা এই ব্ল্যাক হোল দেখতে পেলেন, এই ব্ল্যাক হোলের পরিচিতি, আর কিভাবে এই আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টির ইতিহাস জানতে সাহায্য করবে।

কৃষ্ণগহ্বর আসলে কী?

কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল হল এমন এক মহাজাগতিক বস্তু যা আলো কেও গিলে ফেলে। তার ওজন কত হবে যদিও ঠিক নেই কিন্তু বিজ্ঞানীদের দেখার জন্য সেটা বেশ বড় হতেই হবে, কারন তা না হোলে সেটা বহুদুর থেকে দেখাই বা যাবে কেমন করে?

অত্যন্ত ঘন পদার্থ দিয়ে তৈরি হওয়া ব্ল্যাক হোল এর মহাকর্ষীয় বল ও এত শক্তিশালী যা তার ভিতর থেকে কোন পদার্থ বা আলো কেও বেরোতে দেয় না। শুধুমাত্র ব্ল্যাকহোলের চারপাশের পদার্থ — চরম উত্তপ্ত গ্যাস বা প্লাসমা প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে ঘুরতে ব্ল্যাক হোলের মধ্যে গিয়ে পরে…তারপর কি হয় সেটা কেউ জানে না।

যে সীমারেখা পেরোলে আর ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষ থেকে নিস্তার নেই সেটাই হল “Event horizon” বা ঘটনা দিগন্ত।

আলো যদি না আসে তাহলে আমরা ব্ল্যাক হোল দেখব কি করে?

আমরা আলোর সাহায্যেই দেখি। যে কোন বস্তুর উপর আলো পরে খানিক আলো শোষিত হয়, খানিকটা ফিরে আসে আমাদের চোখে। যেটুকু ফিরে আসে সেটাই আমাদের মস্তিস্ককে জানান দেয় যে আমরা কি দেখছি। এখন এই আলো যদি কোন ভাবে না ফেরে তাহলে আমরা বুঝতেই পারব না যে আমরা আদৌ দেখছি কি না। মানে অনেকটা চোখ বন্ধ করে রাখার মতই অবস্থা।

আবার যেহেতু আলো একপ্রকার তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, এমন হতেই পারে যে যা আমরা দেখতে পাই ঠিক সেই আলো ফিরে এল না, অন্য এক ধরনের আলো ফেরত এল তাহলেও কিন্তু অনেক কিছু ই অদেখা থেকে যায়। আর সে জন্যই বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছেন রেডিও বা বেতার টেলিস্কোপ এর। ব্ল্যাক হোলের চারপাশের ঘূর্ণায়মান পদার্থ, যা কি না প্রায় আলোর সমান গতিবেগে ঘুরছে, তা থেকেই নির্গত হয় এই বেতার তরঙ্গ। এই বেতার তরঙ্গ ধরা পরে রেডিও টেলিস্কোপে যার সাহায্যে আমরা ব্ল্যাক হোলের ছবি দেখতে পাচ্ছি।

এই ব্ল্যাক হোলের নাম ও পরিচিতি

ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপে ধরা পরা এই ব্ল্যাক হোলের নাম “Powehi” পোয়েহি, হাওয়াই ভাষায় যার অর্থ “অন্তহীন সৃষ্টির সৌন্দর্যমণ্ডিত অন্ধকার”(embellished dark source of unending creation)।

এই দৈত্যর ওজন আমাদের সূর্যের ওজনের ৬৫০ কোটি গুন বেশী।

এই কালো দানব “পোয়েহি” আকারে আমাদের সৌরমণ্ডলীর থেকেও বড়।

এই কৃষ্ণগহ্বর পৃথিবী থেকে ৫০ লক্ষ কোটি কোটি (পড়ুন ৫ এর পরে ২০ টা শূন্য) কিলোমিটার দূরে।

২০০ জন বৈজ্ঞানিকের প্রচেষ্টায় তোলা ব্ল্যাক হোলের এই প্রথম ছবি মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি রহস্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে দিল মানব সভ্যতাকে। আইন্সটাইন এর সাধারন আপেক্ষিকতার তত্ব র ও একবার অভ্রান্ত প্রমানিত হল। এই বিষয়ে ৬ টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে “Astrophysical Journal Letters “এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *