রাজভক্ত রবীন্দ্রনাথ?

সাগ্নিক ভট্টাচার্য

বছর ৪-এক আগে RSS-BJP-পন্থী “বুদ্ধিজীবী মেডিকেল ডাক্তার” রাজীব ডিক্সিৎ মহাশয়, যিনি সাধারণত গোমূত্রের গুনাগুন নিয়ে বক্তৃতা দিতেন, একটি ভাষণ দেন যার সারমর্ম ছিল যে রবীন্দ্রনাথের মতো বড় ইংরেজভক্ত ভূভারতে ছিল না এবং বর্তমান ভারতীয় গণরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত “জনগন মন অধিনায়ক জয় হে” (যার আসল নাম ছিল ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’)-ই নাকি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি যুক্তি খাড়া করেছিলেন অকাট্য। তিনি বললেন, যে জনগনের মনের যে অধিনায়কের কথা গানটিতে বলা হয়েছে, তা আসলে ইংরেজ-নরেশ George V। ভারতবর্ষের যে অঞ্চলগুলোর কথা বলা হয়েছে (অর্থাৎ পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল ও বঙ্গ) তা সবকটাই ইংরেজ শাসিত। এমনকি একথাও সত্য যে স্বশাসিত রাজ্যগুলোর কোনো উল্লেখ গানটিতে নেই। নেই হায়দরাবাদ, রাজপুতানা, অসম বা ত্রিপুরার উল্লেখ; অথচ এই রাজ্যগুলোর সম্মন্ধে কবি অবগত ছিলেন না বললে তর্কের ঘোড়া যুক্তির ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে এক্কেবারে কাল্পনিক জগতে ঘাস খেতে চলে যাবে। সে যুক্তি চলবে না। এমনকি অনেকে একথাও বলেন যে: গানটির শেষ স্তবকে  যে বলা হয়েছে “তব করুণারুণরাগে / নিদ্রিত ভারত জাগে / তব চরণে নত মাথা”, তো কবি ১৯১১–১২ সালে এমন কোন জাগরণের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন যার জন্য তিনি তাঁর মাথা নত করছেন?

ডিক্সিৎ মশাইয়ের বক্তৃতা বিরুদ্ধে সহজ পাল্টাযুক্তি উপস্থিত করাই যায় যে তিনি তো গানটিতে এই “ভারত-ভাগ্যবিধাতাকে” বলেছেন ”স্নেহময়ী তুমি মাতা।” তিনি খামোখা রাজামশাইকে ”মাতা” বলতে যাবেন কেন? কিন্তু আমরা, আড্ডাবাজরা ভাবলাম এভাবে উপসর্গের চিকিৎসা করে রোগের উপশম সম্ভব নয় এবং মূল্যান্বেষণ করতে গিয়ে আবিষ্কার করা গেলো কিছু বিস্ফোরক তথ্য।

ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে উঠে আসে যে গানটির এই বিকৃত অর্থ এবং রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে রাজভক্তির অভিযোগ তাঁর জীবনকালেই উঠেছিল। আসল কথা হলো যে এই গানটি প্রথম গাওয়া হয় ১৯১১-এ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর (Indian National Congress) কলকাতা অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ২৭-এ ডিসেম্বর ১৯১১। মুশকিলটা হচ্ছে যে সেই দিনটা নির্দিষ্ট ছিল ব্রিটেনের রাজা ও ভারতের সম্রাট George V-এর “অনুগত স্বাগতানুষ্ঠান”-এর জন্য। তাহলে ডিক্সিৎ-মশাইয়ের ভুল কোথায়? গানটাতো সত্যিই রাজাকে সম্ভাষণ করতে ব্যবহার করা হয়েছিল! কিন্তু হে পাঠক তিষ্ঠ ক্ষণকাল।

২৮ ও ২৯-এ ডিসেম্বর জুড়ে ইংরেজি সংবাদপত্রগুলিতে খবর বেরোয় :

“When the proceedings of the Indian National Congress began on Wednesday 27th December 1911, a Bengali song in welcome of the Emperor was sung. A resolution welcoming the Emperor and Empress was also adopted unanimously.” [বুধবার ২৭-এ ডিসেম্বর ১৯১১, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর দ্বিতীয় অধিবেশনের সূচনায় সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর উদ্দেশ্যে একটি বাংলা গান গাওয়া হয়। ততঃপর সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে সংকল্প পাস করে সভ্যগণ।] (Indian, Dec. 29, 1911, নিজস্ব অনুবাদ)

কিন্তু ভারতীয় সংবাদপত্রগুলি থেকে উঠে আসে একটি সম্পূর্ণ আলাদা ছবি। ২৮-এ ডিসেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়:

“The proceedings of the Congress party session started with a prayer in Bengali to praise God (song of benediction). This was followed by a resolution expressing loyalty to King George V. Then another song was sung welcoming King George V.” [কংগ্রেস পার্টির অধিবেশন এর সূচনায় ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে একটি বাংলা স্তব-সংগীত গাওয়া হয় ও সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের সংকল্প গ্রহণ করে সভা। ততঃপর, সম্রাটের উদ্দেশ্যে বরণগীত ধ্বনিত হয়।] (Amrita Bazar Patrika, Dec. 28, 1911, নিজস্ব অনুবাদ)

ইতিহাসবিদ প্রদীপ কুমার দত্ত লিখেছিলেন যে আসলে ইংরেজি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনটিতে সেইদিন অধিবেশনের সূচনায় গাওয়া দুটি গান একীভূত হয়ে গেছে। বা যাকে চলতি ভাষায় বলে ”গুলিয়ে ফেলেছে”। এই দ্বিতীয় গানটি হলো রামভুজ চৌধুরী বাবু মহাশয়ের “বাদ্শা হামারা” শীর্ষক একটি হিন্দি গান।

অমৃতবাজার পত্রিকা, The Bengalee প্রভৃতি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো থেকে এই তথ্যই উঠে আসছে। কংগ্রেস-এর কার্যবিবরণীও তুলে ধরছে একই ছবি:

“On the first day of 28th annual session of the Congress, proceedings started after singing Vande Mataram. On the second day the work began after singing a patriotic song by Babu Rabindranath Tagore. Messages from well-wishers were then read and a resolution was passed expressing loyalty to King George V. Afterwards the song composed for welcoming King George V and Queen Mary was sung.”

            কিন্তু এই আড্ডার আরম্ভে বলেছিলাম যে কবির জীবনকালেই এই বিতর্ক উঠেছিল। তা কিরকম?

কবি ১৯৩৭-এর ১০-ই নভেম্বর, শ্রীযুক্ত পুলিন বিহারি সেনকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে এক একনিষ্ঠ রাজভক্ত “official” তাঁর কাছে সম্রাটের আগমনের উদ্দেশ্যে একটি গান রচনা করার জন্য অনুরোধ করায় তাঁর মনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় তিনি রাজাকে প্রত্যাখ্যান করে  সেই সর্বশক্তিমান, পরমেশ্বরী, স্নেহময়ী, ঐক্যবিধায়ক, মঙ্গলদায়ক ভারত-ভাগ্যবিধাতাকে উদ্দেশ্যে করে স্তব রচনা করেন। তিনি স্পষ্ট বাক্যে এও লেখেন যে সেই ভাগ্যবিধাতা কখনোই George V বা George VI হতে পারেন না। আরও লেখেন যে তাঁর সেই আমলা বন্ধুর রাজভক্তি কিঞ্চিৎ অত্যাধিক হলেও সে মূর্খ নয়–গানটির আসল মর্ম সে ঠিকই বুঝেছিলো।

১৯৩৯ সালের ১৯-এ মার্চ, পূর্বাশা পত্রিকায় প্রকাশিত এক চিঠিতে কবি লেখেন: যে সব ব্যক্তি তাকে George V-এর উদ্দেশ্যে সংগীতরচনা করার হেতু গঞ্জনা করছেন তাদের চিঠির উত্তর দেওয়াও তিনি অপমান মনে করেন।

এই দুই চিঠি থেকেই বোঝা যায় যে তাঁকেও রাজভক্তির আরোপ ও সেই হেতু যথেষ্ট গঞ্জনা ভোগ করতে হয়েছিল। দ্বারকানাথ ঠাকুর হয়ে থাকতে পারেন ইংরেজদের অনুগত কিন্তু তার কালি তাঁর পৌত্রের উপর নিক্ষেপ করাটা বোধকরি খুবই নীচ রুচির পরিচয় দেয়।

তবে যাবার আগে প্রয়াত রাজীব ডিক্সিৎ মহাশয় ও তার হাজার হাজার হতভাগ্য ভক্তদের মনে করাতে চাই যে পুরো “ট্যাগোর খান্দান [পরিবার]”-কে গালমন্দ করে উনি ভারতবর্ষের যথার্থ জাতীয় সংগীত হিসেবে যে গানটিকে বেছে নিয়েছিলেন–অর্থাৎ “বন্দে মাতরম”, সঙ্গীত আকারে সেই গানটি শুধু তাঁর ঘৃণ্য রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিই নয়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর ১৮৯৬-এর অধিবেশনে প্রথমবার রাজনৈতিক অর্থে গানটি প্রয়োগও করেন সেই “ট্যাগোর” কূলোদ্ভব বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *