বুদ্ধ কথন – পর্ব ২

পড়ে নিন… বুদ্ধ কথন – পর্ব ১

– বুদ্ধ ঠিক কী বলেছিলেন, সেটা এককথায় বলা মুশকিল। তিনি অত্যন্ত গভীর এবং যুক্তিপূর্ণ একটা দর্শনের কথা বলেছিলেন যা আমাদের জীবনে প্রকৃত আনন্দের সন্ধান দিতে পারে। সেই দর্শন যে তুই একদিনেই বুঝে যাবি, সেটা সম্ভব নয়। তার জন্য কিছুটা পড়াশোনা আর অনেকটা ভাবনাচিন্তা প্রয়োজন। আমি আজকে তোকে বুদ্ধের দর্শনের একটা খুব সংক্ষিপ্ত আউটলাইন দিতে পারি। তোর আগ্রহ জন্মালে এটা নিয়ে আমরা ভবিষ্যতে নিয়মিত কথা বলতে পারি।

– -বেশ, আউটলাইনটাই শুনি আগে।

– দ্যাখ, বুদ্ধের দর্শনের বিষয়বস্তু হল মানুষ, অর্থাৎ তুই নিজে। তোর বাইরে কোন ঐশ্বরিক শক্তির ব্যাপারে তো বুদ্ধ তোকে কিছু বলবেনই না, আবার তোর ব্যাপারেও যাকিছু বলবেন তা কেবল বর্তমানের তোকে নিয়েই বলবেন। আগের জন্মে তুই কী ছিলি, বা মৃত্যুর পরে তোর কী গতি হবে, সেসব নিয়েও তিনি কিছু বলবেন না।

— বুঝেছি। বর্তমানের এই যে আমি, এটাই বুদ্ধের আলোচনার বিষয়। তা তিনি কী বলেছেন এই আমির সম্পর্কে?

– এককথায় বলতে গেলে, বুদ্ধের মতে ‘তুই’ বলে কিছু নেই। তুই যাকে ‘তুই’ বলে ভাবিস, সেটা তোর একটা মনগড়া ভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

— সেকি? এ তো ভয়ংকর কথা! এই যে জলজ্যান্ত আমি বসে আছি তোর সামনে, এর কোন অস্তিত্বই নেই, নেহাত মনগড়া ভাবনা?

– তোর অস্তিত্ব তো অবশ্যই আছে। কিন্তু তুই যাকে ‘তুই’ ভাবিস, তার কোন অস্তিত্ব নেই।

— আবার আমার মাথা গুলিয়ে দিচ্ছিস কিন্তু। এইজন্যেই ধর্ম-ফর্ম নিয়ে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না।

– মাথা ঠাণ্ডা কর। আচ্ছা, একটা কথার উত্তর দে। আজ থেকে দশ বছর আগে তুই যা ছিলি, এখনও কি ঠিক তাই আছিস?

— না, ঠিক তা নেই। অনেক চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হয়েছে আমার মধ্যে।

– আবার আজ থেকে দশ বছর বা কুড়ি বছর পরেও কি তোর সব চিন্তাভাবনা আজকের মতোই থাকবে বলে তোর মনে হয়?

— না, তাও থাকবে না।

– তার মানে দ্যাখ, তুই আসলে একটা ফ্লো, বহতা নদীর মতো। প্রতিনিয়ত বাইরের পরিবেশের সঙ্গে তোর ইন্টার‌্যাকশন চলছে আর তার ফলে তুই ক্রমশ পালটে পালটে যাচ্ছিস। এই যে স্রোতের মতো তুই বয়ে চলেছিস, এর মধ্যে তুই কোথাও একটা ফিক্সড এসেন্স, একটা কন্সট্যান্ট কিছু খুঁজে পাবি না যাকে তুই ‘আমি’ বলে চিহ্নিত করতে পারিস। তাই নয় কি?

— হ্যাঁ, কথাটা যুক্তিযুক্তই মনে হচ্ছে বটে।

– অথচ দ্যাখ, তোর মনের গভীরে কোথাও একটা তুই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ওইরকম একটা স্বতন্ত্র, অপরিবর্তনীয় ‘আমি’র ধারণা পোষণ করে রেখেছিস।

— হ্যাঁ। সে তো রেখেছিই। সেইজন্যেই তুই যখন বললি, ‘আমি’ বলে কিছু নেই, তখন এক মুহূর্তের জন্য কেমন ইনসিকিউর্ড হয়ে গেছলাম।

– এটাই হল আমাদের সমস্যা। আমাদের মধ্যে কোন স্থির ‘আমি’ নেই, অথচ আমরা এরকম একটা মিথ্যে আমিত্বের ধারণা মনের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে লালন করে চলেছি।

— কিন্তু তাতে সমস্যাটা কোথায়?

– দ্যাখ, যদি স্থির ‘আমি’ বলে সত্যিই কিছু থাকত, তাহলে কোন সমস্যা হত না। কিন্তু যেহেতু সেরকম কিছু বাস্তবে নেই, কেবল আমাদের কল্পনাতেই আছে, তাই বাস্তবের সঙ্গে আমাদের কল্পনার প্রতি মুহূর্তে ঠোকাঠুকি লাগে। আমরা যতই দৃঢ়ভাবে এই আমিত্বকে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করি, বাস্তব জগত ততই আমাদের সেই মিথ্যে ধারণাকে আঘাত করতে থাকে। এই লড়াইটা প্রতি মুহূর্তে আমাদের করতে হয় বলেই আমাদের মনে এত দুঃখ, এত রক্তক্ষরণ।

— তাহলে উপায়টা কী?

– উপায় হল এই মিথ্যে আমিত্বের ধারণাকেই চিরতরে বিসর্জন দিয়ে দেওয়া। বুদ্ধ সেটাই আমাদের করতে বলেন। সেটা অবশ্য একদিনে সম্ভব নয়, তার জন্য দীর্ঘ চেষ্টার প্রয়োজন।

— হুঁ, ব্যাপারটা সত্যিই ভাববার মতো। ধর্মের মধ্যে যে এতকিছু আছে, আমি ভাবতে পারতাম না।

– এটাই হল ধর্মের শেষ কথা। এই মিথ্যে আমিত্বের নাশ। এটা যে করতে পেরেছে, সেই হল প্রকৃত ধার্মিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *