Home » জ্ঞান জগত » বুদ্ধ কথন – পর্ব ১

বুদ্ধ কথন – পর্ব ১

সৌমেন পাত্র

– গৌতম বুদ্ধের সম্পর্কে তোর কী মনে হয়?

– – বুদ্ধদেব?  আমার কিন্তু ওনাকে খুব ভালো লাগে। অবশ্য তুই জানিস, একজন আধুনিক, প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাতে আমি একদম পছন্দ করি না। আমার ধারণা, একমাত্র বুড়ো আর সেকেলেরাই ধর্ম নিয়ে ভাবে। তবু কেন জানি না, বুদ্ধদেবকে আমার ভালোই লাগে।

– আচ্ছা। তুই নাস্তিক হয়ে গেছিস? এটা কিন্তু জানতাম না!

– – না, ঠিক নাস্তিক নয়। মানসিক সংকটে পড়লে আমি ভগবানকে স্মরণ করি। কিন্তু সেটা তো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই না?

-হ্যাঁ, তা তো বটেই। তবে একটা কথা। তুই বিপদে পড়লে যে দেবতাকেই ডাক, বুদ্ধকে কখনও ডাকিস না। উনি দেবতা-টেবতা ছিলেন না, নেহাত একজন মানুষ ছিলেন। উনি নিজেও ভগবান-টগবান নিয়ে কোন কথা বলেন নি, নিজেকে ভগবান বলে দাবি করা তো অনেক দূরের কথা। তাই ওনাকে ‘বুদ্ধদেব’ বলাটা ঠিক নয়।

– -আচ্ছা। বুঝলাম।

-একটা কথা বল তো। তুই ধর্ম পছন্দ করিস না। অথচ তোর বুদ্ধকে ভালো লাগার কারণ কী?

— দ্যাখ, উনি একজন রাজপুত্র ছিলেন। ওনার বিলাসব্যসনের কোন অভাব ছিল না। সুন্দরী স্ত্রী ছিল, পুত্রও ছিল। অথচ সেসব হেলায় উড়িয়ে দিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। ছোটবেলায় ওনার গৃহত্যাগের গল্প পড়তে কী যে ভালো লাগত! এখনও পরিস্কার মনে আছে। রাজার ছেলে তো, কোনদিন কোন দুঃখকষ্ট দেখেন নি। তারপর সারথির সাথে রথে চড়ে বেড়াতে গিয়ে একে একে দেখলেন জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু। দেখে সংসারের অসারতা বুঝতে পারলেন। তারপর আরেক দিন বেড়াতে গিয়ে দেখলেন এক প্রসন্নবদন সন্ন্যাসী। বুঝলেন, সন্ন্যাসই একমাত্র সংসারের দুঃখ থেকে মুক্তি দিতে পারে। তারপর কাউকে কিছু না বলে একদিন রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। কী থ্রিলিং একটা ব্যাপার ভাব!

– হুঁ। তারপর?

— তারপর আর কী? পরম সত্যকে জানার জন্য দীর্ঘদিন বিস্তর কৃচ্ছসাধনা করলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। শেষে সুজাতার দেওয়া পায়েস খেয়ে বোধিবৃক্ষের নীচে ধ্যানে বসলেন। আর একদিন লাভ করলেন পরম জ্ঞান বা বোধি।

– বাহ। তা তাঁর সেই পরম জ্ঞানটা কী? ঠিক কী জ্ঞান তিনি লাভ করেছিলেন? তাঁর মতবাদ কী ছিল?

— এই রে। এটা আমি কখনও ভাবি নি। ছোটবেলার বইতেও অত কিছু ছিল না। তবে ইতিহাসে পড়েছি, তিনি ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন, জাতিভেদ প্রথা মানতেন না।

– সে নাহয় মানতেন না। কিন্তু সে তো গেল তাঁর সামাজিক অবস্থান। তাঁর ধর্মীয় মতবাদটা কী ছিল? শুধু জাতিভেদ মানি না, এরকম একটা নঞর্থক বক্তব্য দিয়ে নিশ্চয় কোন ধর্মমত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। বোধিবৃক্ষের নীচে ধ্যান করে তিনি ঠিক কী জ্ঞান লাভ করেছিলেন?

— সেটা তো ঠিক জানি না। ও, মনে পড়েছে। অহিংসা। “অহিংসা পরমঃ ধর্মঃ” – এই ছিল ওনার বাণী। হিংসা কোরো না, হত্যা কোরো না, সবাই মিলেমিশে শান্তিতে থাকো।

– আর ওনার এই মতের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই সম্রাট অশোক যুদ্ধ-টুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই তো?

— হ্যাঁ, হ্যাঁ। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর। কিন্তু ওই অহিংস নীতির জন্যেই আবার অশোকের পরে মৌর্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেল।

-আর বুদ্ধের অহিংস নীতি গ্রহণ করার জন্যই তার পর থেকে ভারতবর্ষ বারবার বিদেশী শত্রুদের পদানত হয়েছে। তাই নয় কি?

— হ্যাঁ। ঠিকই বলেছিস। অহিংস নীতি কিন্তু বাস্তবে কাজ করে না।

– তার মানে যে বুদ্ধকে তোর এত ভালো লাগে, তাঁর প্রধান মতবাদটাই তোর কাছে একটা অবাস্তব ব্যাপার?

— হ্যাঁ, ব্যাপারটা সেরকমই দাঁড়াচ্ছে বটে। আসলে এতটা তলিয়ে কখনও ভাবি নি।

– আচ্ছা, আরেকটা কথা বল। ওই যে জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু দেখার গল্পটা বললি, সন্ন্যাস নিলেই ওগুলোর সমাধান হয়ে যাবে কিভাবে? সন্ন্যাসী কি কখনও বৃদ্ধ হবে না, না তার কখনও রোগজ্বালা হবে না, নাকি তার কখনও মৃত্যু ঘটবে না?

— হ্যাঁ, সেটাও একটা কথা। তাহলে?

– এখানেই জন্মান্তরের গল্প আসছে। হিন্দুদের মতোই বৌদ্ধরাও জন্মান্তরে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ এক জীবনে আমাদের কারও রক্ষা নেই। আমাদের বারবার জন্ম হতে থাকে আর বারবারই আমরা এইসব জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর কষ্ট পেতে থাকি। তাই এসব থেকে চিরতরে রক্ষা পাবার একমাত্র উপায় হল আর না জন্মানো – জন্মান্তরের চক্রটাকে একেবারে থামিয়ে দেওয়া। এটাকেই হিন্দুরা বলে মোক্ষ, আর বৌদ্ধরা বলে নির্বাণ।

— হ্যাঁ, হ্যাঁ। বুদ্ধ নিজেই তো তাঁর পূর্বজন্মের কথা বলেছেন জাতকের গল্পে। কখনও তিনি সিংহ হয়ে জন্মেছিলেন, কখনও হরিণ হয়ে, কখনও…

– না। বুদ্ধ কখনও জন্মান্তরের কথা বলেন নি। জাতকের গল্পগুলো অনেক পরে বানিয়ে তাঁর মুখে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। জন্মান্তরের যে তত্ত্বটা এখুনি বললাম, ওটাও বুদ্ধের কথিত নয়, বৌদ্ধরা পরে বানিয়েছে হিন্দুদের অনুকরণে।

— তাহলে ওই জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর গল্পটা?

– ওটাও ডাহা মিথ্যে। ঠিক যেমন মিথ্যে রাতের অন্ধকারে গৃহত্যাগের গল্পটা। আসলে গৌতম তাঁর বাবা-মাকে জানিয়ে তাঁদের সামনেই গৃহত্যাগ করেছিলেন।

— বলিস কি রে? তার মানে গৌতম বুদ্ধের সম্পর্কে এতদিন যা জানতাম, সবই ভুল?

– হ্যাঁ। অহিংসার উপরেও উনি অতটা জোর দেন নি। উনি নিজে মাংস খেতেন। আর শত্রু আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতেও উনি কোথাও নিষেধ করেন নি। সম্রাট অশোকও কলিঙ্গের পরে আর কোন যুদ্ধ না করলেও সেনাবাহিনী ঠিকই রেখেছিলেন। তাই তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সাম্রাজ্যে কেউ আঁচড় কাটতে পারে নি। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরিদের অযোগ্যতার কারণে মৌর্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়, অশোকের অহিংস নীতির জন্য নয়।

— আমার এবার মাথা ঘুরছে। অহিংসা নয়, জন্মান্তর নয়, আবার ভগবান নিয়েও কোন কথা বলেন নি। ওনার বক্তব্যটা কী ছিল তাহলে? উনি ঠিক কী বলেছিলেন?

– সেটা তোকে আরেক দিন বলব। আগে মাথাঘোরাটা বন্ধ হোক। নে, এক কাপ কফি খা।

2 thoughts on “বুদ্ধ কথন – পর্ব ১”

আপনার মতামত:-