জাদু । ধৰ্ম । বিজ্ঞান

সাগ্নিক ভট্টাচার্য

এই তিনটে এক সারিতে কি করে ফেললাম জিজ্ঞেস করছেন? বিশেষ করে শেষেরটা? কিন্তু আজ এমন একজনকে নিয়ে আমাদের আড্ডা যিনি ঠিক এইটাই ইঙ্গিত করেছিলেন। প্রথম আড্ডাটা এক নৃতাত্ত্বিক-কে দিয়ে শুরু করেছিলাম। আজ বলবো আরেক নৃতাত্ত্বিকের কথা — অবশ্য ইনি বাঙালি নন, ইংরেজ। আজ বলবো নৃতত্ত্বের আদিপুরুষ জেমস্ ফ্রেজার (Sir James Frazer)-এর কথা।

নৃতত্ত্বের আদিপুরুষ বলার কারণ হলো যে, এই ফ্রেসার-ই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনে করা প্রথম নৃতাত্ত্বিক| গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “ক্লাসিক্স” বা গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্যে ফেলোশিপ লাভ করে তিনি এক প্রবল জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন|  তৎকালীন ইউরোপীয়  বুদ্ধিজীবীদের মতে, প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সমাজই ছিল সভ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি। এবং এই পটভূমিতে ফ্রেসার-এর কাছে “Rex Nemorensis” বা নেমী-র রাজার সংস্কারই হয়ে উঠলো এক্কেবারে বিষফোঁড়া।

আরও পড়ুন…বাঙালির ইনভেনশন?

রোমান-দের এক অংশ বিশ্বাস করতো যে, ইতালির নেমী-হ্রদের ধারে যে বিশাল অরণ্যাবৃত অঞ্চল ছিল তার “রাজা” ছিল ডায়ানা-দেবীর উপাসক এক ‘দাস’। কিন্তু প্রথানুসারে এই পলাতক দাস নেমীর প্রাক্তন রাজাকে সেই অরণ্যেরই এক গাছের ডাল দিয়ে হত্যা করে অরণ্যাধিপতি হয় এবং দাস-অবস্থা থেকে মুক্তিলাভ করে। আবার সময় হলে, আরেক পলাতক এসে একই ভাবে বর্তমান রাজাকে হত্যা করে ভবিষ্যতের নেমী-রাজ ও Diana-র উপাসক হবে।

ফ্রেসার ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বললেন যে, এই সংস্কার কোনোভাবেই সভ্য রোমানদের মস্তিষ্কপ্রসূত হতে পারে না। তারা সমস্বরে ঘোষণা করলেন: এই প্রথা এক্কেবারে বর্বর এবং নির্ঘাত বর্বরদের থেকেই রোমানদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল। কিন্তু ফ্রেসার ভেবে বলেন যে তা বড়ো সহজে সম্ভব নয়। রোমানরা যদি বর্বর সংস্কারে এতই আকৃষ্ট হয়, তাহলে আর তারা সভ্য হলো কি করে? ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝাও তো সভ্যতার সংজ্ঞায় আছে না কি?

তাঁর মতে মানুষের সমাজের বিবর্তন ঘটেছে হাজার হাজার বছর ধরে; এবং সেই বিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে মানুষের আচার-বিচার। ফ্রেসারের “মানুষ” হলো ‘স্বভাবতই দার্শনিক’ যে তার চারপাশে ঘটে চলা বিশ্ব-প্রকৃতির লীলা ব্যাখ্যা করে চলেছে নিজের মতো করে এক এক কালে, এক এক ভাবে। এবং এই ব্রহ্মান্ডের রহস্য ভেদ করতেই সে আবিষ্কার করেছে জাদু, ধৰ্ম ও সব শেষে বিজ্ঞান।

কিন্তু তাহলে নেমী-র রাজার কথা তুললাম কেন জিজ্ঞেস করছেন? ফ্রেসার বলেছিলেন যে মানুষের সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে তার চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন ঘটলেও কোনো কোনো আদিম রীতি-নীতি সংক্রমিত হয় বিবর্তিত সমাজের মধ্যে। এগুলোকে তিনি “survivals” বলে নামাঙ্কিত করেছিলেন। ফ্রেসার-এর মতে এই নেমী-র সংস্কার হলো বর্বর-যুগ থেকে বিধাতার নজর এড়িয়ে বেঁচে থাকা এক ”survival”।

কিন্তু শুধু ভাবলেই তো হবে না, এ তো আর Aristotle যুগ নয় মশাই! প্রমাণ কই? এই প্রমাণের সন্ধানে তিনি এক সাংঘাতিক কান্ড করে বসলেন : রচনা করলেন ১২-টি খন্ডে তাঁর অমর সৃষ্টি—”The Golden Bough: A  Study in Magic and Religion”। তিনি সারা পৃথিবীর যে সভ্যতার যে সংস্কার, যে আদীবাসীদের যে রীতির খবর পেতেন, তা পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করতে আরম্ভ করলেন। এই প্রচেষ্টায় তিনি ফরাসি কৃষকদের সঙ্গে তুলনা করেছেন হিন্দু শ্রাদ্ধবিধি, আফ্রিকার বান্টু-উপজাতির জীবন-দর্শনের সঙ্গে করেছেন উত্তর ইউরোপের নর্ডিক মানুষদের দেহ-সৎকার প্রথার তুলনা। তাঁর এই বিশাল প্রচেষ্টা ১৮৯০ থেকে ১৯১৫ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। এই রচনার ফলে তাঁর কপালে জোটে বিশ্বজোড়া অমর খ্যাতি এবং বিজ্ঞান জগৎ লাভ করে ‘Comparative Anthropology’ বিষয়টি।

ফ্রেসার-এর যুগান্তকারী দাবি ছিল যে, ”জাদু” এবং আধুনিক ”বিজ্ঞান”-এর মূলে আসল বিষয়বস্তুটি কিন্তু এক। যে ‘ওঝা’ বিশ্বাস করে যে সঠিক পদ্ধতিতে সঠিক উপাদানযোগে মন্ত্রোচ্চারণ করলে কাঙ্খিত ফললাভ হবে, আর যে ডাক্তার বলে যে সঠিক ওষুধ ঠিক ভাবে প্রয়োগ করলে রোগের উপশম হবে, উভয়ের মধ্যে causality বা কারণ-ও-প্রভাবের উপলব্ধিতে কিন্তু কোনো পার্থক্য নেই। বারো খন্ডের গবেষণা এক লাইনে বলতে গেলে ফ্রেসার-সাহেবের বক্তব্য হলো যে ‘মানুষ’ যতই প্রকৃতি সম্মন্ধে জেনেছে, ততই সে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করেছে। এই ভাবেই জাদু (প্রকৃতিকে নিজের ইচ্ছেয়ে চালিত করার বিশ্বাস) থেকে সে ঈশ্বর ও ধৰ্ম (পরমাত্মার কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে কাঙ্খিত ফললাভের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা) আবিষ্কার করেছে। এবং শেষে সে বিজ্ঞানের সূত্রে (laws of nature) উপলব্ধি করেছে প্রকৃতির অটল চরিত্রের সামনে নিজের শক্তিহীনতা।

আরও পড়ুন…রাজভক্ত রবীন্দ্রনাথ?

Sir James Frazer এবং তাঁর গবেষণাকে যদি ঐতিহাসিক পটভূমিতে ফেলতে হয় তাহলে দেখা যাবে যে তাঁর তত্ত্বের মধ্যে নিহিত আছে তখনকার দুটো ভাবধারা। প্রথমটি হলো Darwin-এর বিবর্তনবাদ (এই ক্ষেত্রে সামাজিক বিবর্তনবাদ বা Social Darwinism)। এই তত্ত্বটিকে যেমন নিন্দা করা হয়েছে জাতিবৈষম্যের ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সৃষ্টি করার জন্য, তেমনি ফ্রেসারকে মনে করা হয়েছে তার সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা এক মানুষ যিনি জাতিবৈষম্যে বিশ্বাস করলেও সকল জাতিকে একই প্রজাতির বিবর্তনের বিভিন্ন অবস্থা হিসেবে কল্পনা করেছেন। যেমন তিনি আফ্রিকার উপজাতিদের বলেছেন ”বর্বর”, তেমনি বলেছেন যে শ্বেতবর্ণ ইউরোপীয়রাও এককালে বর্বর ছিল।

 দ্বিতীয়ত, ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ এবং বৃহত্তর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া তাঁর গবেষণা এবং সম্পূর্ণ Anthropology বিষয়টিই আদৌ সম্ভব হতো কিনা এই নিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবীরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে যে পরিমাণ তথ্য এবং জ্ঞান সুদূর আফ্রিকা ও এশিয়ার নানান প্রান্ত থেকে এসে পৌঁছতো তা সেই সময়কার পরিবেশে কল্পনা করা খুবই আশ্চর্যের। আমাদের পরবর্তী আড্ডায় এই বিশ্বজোড়া জ্ঞান-প্রবাহ নিয়ে আপনাদের আরো কিছু জ্ঞান দেব। আর সেই আসরে বিরাজ করবেন England-এর বিজ্ঞানের আরেক তারকা। Frazer-এর নাম যদি নাও শুনে থাকেন, তাহলেও এনার নাম শুনতে আপনারা বাধ্য।

তবে এতো জ্ঞানের বাণী শুনে আমাদেরও ফ্রেসার-এর আদিমমানুষের মতো অবস্থা হবে কিনা জানি না। আড্ডার শেষে আমাদেরও সমস্বরে বলতে না হয়: “For in much wisdom is much grief. Whoever increaseth knowledge increaseth sorrow.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *