তুলনাহীনা

স্বপ্নে দেখলাম এক অপরূপ নারীকে। বাকি ৯০ শতাংশ স্বপ্নের মতো এই স্বপ্নের অবস্থানও ভারতেই ছিল, আমার বর্তমান ঠিকানা জার্মানিতে নয়। স্বপ্ন, এই alternate reality টাই তো ফিরে ফিরে নিয়ে যায় আমায় “back home” এ- আমার “long lost friend” এর কাছে। জরির কাজ করা সাদা শাড়ি, লাল পাড়, কপালে টিপ, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, কানে গলায় সাদা মুক্তোর সাজ। অন্য কোনো স্বপ্নের এত নিখুঁত স্মৃতি আমার আর নেই। মুখে হাল্কা মেকআপ, আয়ত নেত্রে হাল্কা কাজলের ছোঁয়া, মাথায় ঘন কালো চুলের বড় খোপাতে জুঁই ফুলের মালা, তার সাথে আবার কানের পাশে টকটকে লাল থোকা থোকা পলাশ ফুল। পলাশ ফুলটার কেন সংযোজন হলো, ঠিক বুঝলাম না। যাই হোক, অসাধারণ লাগছিলো। বয়স পঞ্চাশের ঘরে হলে কি হবে, এই দীর্ঘাঙ্গীর স্নিগ্ধ রূপের ঝলক বহু দূর থেকে অনুভব করা যাচ্ছিল। সর্বোপরি, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মার্জিত আভিজাত্যপূর্ণ হাসি আর চোখের মধ্যে জ্বলজ্বল করা আত্মবিশ্বাস।

নাঃ, এ নারীর চোখে সন্তানের থেকে দূরে থাকার বিষাদ মাখা ভালো থাকার চেষ্টা নেই। এ নারী অনেক বলিষ্ঠ, শত অভিজ্ঞতায় জ্ঞানবৃদ্ধ হয়েও জীবনের প্রতি তীব্র ধনাত্মক দৃষ্টিময়। এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা তাই “জনসমুদ্রে ফেনিল চূড়ায় ফসফরাসের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকলো মিছিলের সেই মুখ”।

দীর্ঘ দেড় বছর পর বিদেশে গবেষণা রত মেয়ে আজ ফিরছে ক’দিনের জন্য। মেয়ের হাতে দুটো ভারী স্যুটকেস, আর কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ থাকা সত্ত্বেও হাঁটার গতি স্তিমিত হয়নি। Arrival এর দরজা দিয়ে baggage সংগ্রহ করে বেরিয়েই চোখে পড়লো স্মিত হাস্যময় চোখ জোড়া। না, দেড় বছরে আমার সেই অতিরিক্ত চিন্তা করা insecure মা টা কিন্তু অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। মেয়ের বিদেশে একাকী সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর আত্মবিশ্বাসী হওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে, গোপনে সেই যজ্ঞে নিজেকেও ক্রমে ভেঙে গড়ছে পলাশ সজ্জিত এই স্মিত হাস্যময়ী। হাতে ট্রলি ব্যাগগুলো কোনো রকমে দাঁড় করিয়ে এত দিনের অপ্রকাশিত অনুভূতি গুলোকে খাঁচা থেকে মুক্ত করলো নীলাঞ্জনা। দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরলো মাকে। মুহূর্তের সেই অনুভূতির তীব্রতায় আমার ঘুম ভেঙে গেল।

চারিদিকে তো অন্ধকার। ওহ, এটা স্বপ্ন ছিল। বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো স্থান কাল বুঝতে। হ্যাঁ, এখন তো আমি আমেরিকায় আছি কদিনের জন্য গবেষণার কাজে। ওটা স্বপ্ন ছিল। সত্যি বলতে কি, কোনো দুঃখ পেলাম না। পরিমাপগত শারীরিক দূরত্বটা যে মনের কাছে মূল্যহীন সেটা সত্যি এখন বুঝতে শিখেছি। মা তো আমার সাথেই আছে, আমার প্রতিদিনের পরিবর্তন অপরিবর্তনের খেলায়। নাঃ, ভালোবাসার মানে এতদিনে তাহলে বুঝলাম! পাশ ফিরে আরাম করে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম কম্বল টা টেনে নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *